Image

অরবিন্দ কৃষ্ণ মেহরোত্রার কবিতা : ইন্দিরা গান্ধি ও মলয় রায়চৌধুরীকে উৎসর্গ করা

index

Advertisements

জীবনানন্দের জন্মদিনে খালাসিটোলায় টেবিলের ওপরে নেচেছিলেন হাংরি গল্পকার অবনী ধর

42910091_704166883286415_6020569788416262144_n

১৯৬৮ সালের সন্ধ্যা । হাংরি আন্দোলনকারীরা খালাসিটোলায় জড়ো হয়েছেন জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন পালনের জন্য । টেবিলে উঠে পড়লেন অবনী ধর আর নাচের সঙ্গে গাইতে লাগলেন এই গানটা, যা তিনি জাহাজে খালসির কাজ করার সময়ে গাইতেন, বিদেশি খালাসিদের সঙ্গে । উপস্হিত সবাই, এমনকি হাংরি আন্দোলনের কয়েকজন ভেবেছিলেন গানটা আবোল-তাবোল, কেননা ইংরেজিতে তো এমনতর শব্দ তাঁদের জানা ছিল না । যে সাংবাদিকরা খবর কভার করতে এসেছিলেন তাঁরাও গানটাকে ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীদের বজ্জাতি, প্রচার পাবার ধান্দা । পরের দিন দি স্টেটসম্যান যে সংবাদ দিয়েছিল তাতে ভাসা-ভাসা উল্লেখ ছিল । সেই সপ্তাহের ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ শিরোনামে ঠাট্টা করে দুই পাতা চুটকি লেখা হয়েছিল, অবনী ধরের কার্টুনের সঙ্গে ।

     ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ তকমাটি যিনি ব্যবহার করেছিলেন তিনি জানতেন না যে এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন গারট্রুড স্টিন এবং বিশ শতকের বিশের দশকে প্যারিসে আশ্রয় নেয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, টি. এস. এলিয়ট, জন ডস প্যাসস, ই ই কামিংস, আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ, হার্ট ক্রেন প্রমুখকে বলা হয়েছিল ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সদস্য ।

অবনী ধর-এর নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন । যাঁরা তাঁর নাম শোনেননি এবং ওনার একমাত্র বই ‘ওয়ান সট’ পড়েননি, তাঁদের জানাই যে ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে মান্যতা দিলে বলতে হয় যে অবনী ধর ছিলেন হাংরি আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ ছোটো গল্পকার ।

 

গানটা এরকম, মোৎসার্টের একটা বিশেষ সুরে গাওয়া হয়:

জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,

জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।

জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,

জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।

হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা উউউউউহ,

হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা, উহ

শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি ।

উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ ।

 

১৯২০ সালে,, প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বোরির জন্য, রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েল, প্রথম বারন ব্যাডেন-পাওয়েল (স্কাউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা) সিদ্ধান্ত নেন যে একটা মজার গান পেলে ভালো হয়, যা সব দেশের স্কাউটরা গাইতে পারবে ; কারোরই কঠিন মনে হবে না । উনি মোৎসার্টের  এক নম্বর সিম্ফনির ইবি মেজরে বাঁধা সুরটি ধার করেছিলেন । গানটা স্কাউটদের মধ্যে তো বটেই সাধারণ স্কুল ছাত্রদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়েছিল । এই স্কাউটদের কেউ-কেউ জাহাজে চাকরি নিয়ে খালাসি এবং অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে এটাকে ছড়িয়ে দিতে সফল হন । অবনী ধর বেশ কিছুকাল জাহাজে খালাসির কাজ করেছিলেন এবং তাঁরও ভালো লেগে যায় সমবেতভাবে গাওয়া গানটি । শতভিষা, কৃত্তিবাস, কবিতা, ধ্রুপদি পত্রিকার কর্নধারদের প্রিয় সঙ্গীত-জগত  থেকে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া এই গান সেসময়ে নিতে পারেননি সাংবাদিক আর বিদ্যায়তনিক আলোচকরা, তার ওপর যেহেতু হাংরি আন্দোলনের ব্যাপার, তাই তাঁরা এটাকে অশিক্ষিত নেশাখোর-মাতালদের কারবার ভেবে হেঁ-হেঁ করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ।

প্রথম ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ও প্রথম ছোটোগল্পকার পূর্নচন্দ্র থেকে হাল আমলের মফসসলের কথাসাহিত্যিক, প্রান্তিক ও শহুরে গল্পকার কিংবা মেট্রপলিটান ঔপন্যাসিক, তাঁদের লেখক প্রতিস্ব অবিনির্মাণ করলে প্রথম যে উপাদানটি পাওয়া যাবে, তা তাঁদের মাতৃভাষায় এবং অন্যান্য যে ভাষায় তাঁদের দখল আছে, সে ভাষায় পূর্ব প্রজন্মগুলোর সাহত্যিকদের লেখা গল্প-উপন্যাসের পঠন-পাঠনের জমা করা স্মৃতি । ব্যক্তিপ্রতিস্ব নির্মাণে ভাষার অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু লেখক-প্রতিস্ব নির্মাণে ভাষাসাহিত্যের জ্ঞান তথা সাহিত্যের বিশেষ ঝোঁকের প্রতি লেখকের টান, তাঁর লেখনকর্মের আদল আদরা দিশা তাৎপর্য অন্তর্নিহিত-সম্পদ দাপট চৈতন্য অস্তিত্ব আত্ম-উন্মোচন এমনকী তাঁর সাহিত্য চক্রান্তক কলমটির গঠনকারী মূল উপাদান । তাঁদের লেখন-অভিজ্ঞতার মালিকানার বখরা কিন্তু তাঁদের পড়া পূর্বসূরী গল্পকার-ঔপন্যাসিক-দার্শনিকদের প্রাপ্য।

আমি যে প্রতিস্ব-নির্মাণের কথা বলছি তা বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ বাঁকবদলের সময়কার । উল্লেখ্য যে ভারতবর্ষে পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, বেতাল পঞ্চবিংশতি, কথাসরিৎসাগর, বৃহৎকথা, কথামঞ্জরী, দশকুমার চরিত, বাদবদত্তা ইত্যাদি গদ্যে রচিত কথাবস্তুর অতিপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে । ইংরেজরা আসার পর, এবং ফলে, বাংলা গদ্যসাহিত্য ও গদ্যে নানা ধরণের সংরূপের উদ্ভব জলবিভাজকের কাজ করেছিল ; আমি সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি । এক নতুন নন্দনক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল সাহিত্যের এলাকায়, যে এলাকায় লেখক নামের নির্মিত-প্রতিস্বের মানুষটির লেখনকর্মকে কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে নৈতিকতা আর বৈধতা আরোপের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল । ফলে লেখনকর্ম বা পাঠবস্তুতে সতত কেন্দ্র দখল করে থাকলেন লেখ-সৃষ্টিকারী ব্যক্তিমালিকটি ।

ইংরেজরা আসার পরই, আর বাংলা কথাসাহিত্যের শুরুতেই যে লেখকরা নির্মিত-প্রতিস্ব নিয়ে লেখন-পরিসরে নেমেছিলেন, তা কিন্তু নয়। লেকন পরিসরে ব্যক্তিনামের লালন, ব্যক্তি-আধিপত্যের ছাপ, ব্যক্তিপ্রসূত রচনাগত মৌলিকতা, ব্যক্তিসৃজনশীলতা ইত্যাদি প্রতর্কগুলো হিন্দু বাঙালির জীবনে প্রবেশ করতে পেরেছিল  সেই সময়কার কলকাতায় ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির মননবিশ্বটি পাকাপাকি ভাবে থিতু হয়ে বসার পর । ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা, ১৮৩৫ থেকে শিক্ষার বাহন হিসেবে ইংরেজি, তারপর ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষিত বাঙালির সমাজে ওই মননবিশ্ব প্রবেশ করতে পেরেছিল। বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে, লেখক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের মননবিশ্বটি ওই আদরায় নির্মিত হবার পর এবং ফলে, আর একই কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাই পূর্ণচন্দ্র দ্বারা রচিত হলো, ১৮৭৩ সালে, প্রথম বাংলা ছোটোগল্প ‘মধুমতী’ । তার আগে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এবং ১৮৩১ সালে প্রকাশিত ‘নববাবুবিলাস’ আর ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’ পাঠবস্তুগুলোতে ওই মননবিশ্বের ছাপ ছিল না ।

পূর্ণচন্দ্র তাঁর গল্পটিতে নামস্বাক্ষর করেননি । ‘নববাবুবিলাস’ আর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ছদ্মনামে লেখা । নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘বাংলা ছোটোগল্প — সংক্ষিপ্ত সমালোচনা’ বইতে জানিয়েছেন যে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সময়কালে ( ১২৮০ থেকে ১৩০৬ বঙ্গাব্দ ) বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একশ ছাব্বিশটি ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছিল যেগুলোয় লেখকরা নামস্বাক্ষর করেননি, এমনকী ছদ্মনামও নয় । রচনার সঙ্গে লেখকের নাম দেওয়ার প্রথাটি প্রবর্তন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবশালী প্রতিনিধি । সেসময়ে ব্রা্‌হ্মধর্ম হয়ে উঠেছিল ওই মননবিশ্বের ধারক ও বাহক । নামস্বাক্ষর না-করার প্রক্রিয়াটি থেকে স্পষ্ট যে কথাবস্তুর রচয়িতারা জানতেন না যে লেখকসত্তা বলে কোনো ব্যাপার হয়, এবং লেখকের নামটি সত্তাটিকে বহন করে । কোনও কথাবস্তু যে মেধাস্বত্ত, সে ধারণাটির প্রতিষ্ঠা হতে সময় লেগেছিল । তার কারণ অস্তিত্বের কেন্দ্রে ব্যক্তিমানুষকে স্হাপনের কর্মকাণ্ডটির প্রভাব, যাকে উনিশ শতকের রেনেসঁস বলা হয়, সেই চিন্তাচেতনাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য অজস্র নির্মিত-প্রতিস্বের প্রয়োজন ছিল । ইউরোপীয় চিন্তনতন্ত্রটির বাইরে যে নন্দনক্ষেত্রটি রয়ে গেল, জলবিভাজিকার অন্য দিকে, তাকে বটতলা নামে এইজন্য দোষারোপ করা হল যে সেই এলাকায় ব্যক্তিএককগুলো অনির্মিত। জেমস লঙ বললেন বটতলার বইগুলো অশ্লীল ও অশোভন, যার দরুন বাংলার সংস্কৃতি থেকে লোপাট হয়ে গেল বইগুলো ।

ইউরোপ থেকে আনা সাহিত্য-সংরূপগুলোর সংজ্ঞার স্বামীত্ব, তাদের ব্যাখ্যা করার অধিকার, দেশীয়করণের বৈধতা, সেসব বিধিবিধান তত্বায়নের মালিকানা, কথাবস্তুটির উদ্দেশ্যমূলক স্বীকৃতি, চিন্তনতন্ত্রটির অন্তর্গত সংশ্লেষে স্বতঃঅনুমিত ছিল যে, অনির্মিত লেখকপ্রতিস্বের পক্ষে তা অসম্ভব, নিষিদ্ধ, অপ্রবেশ্য, অনধিকার চর্চা । ব্যাপারটা স্বাভাবিক, কেননা যাঁরা সংজ্ঞাগুলো সরবরাহ করছেন, তাঁরাই তো জানবেন যে সেসব সংজ্ঞার মধ্যে কী মালমশলা আছে, আর তলে-তলে কীইবা তাদের ধান্দা । ফলে, কোনও কথাবস্তু যে সংরূপহীন হতে পারে, লেখক-এককটি চিন্তনতন্ত্রে অনির্মিত হতে পারে, রচনাকার তাঁর পাঠবস্তুকে স্হানাংকমুক্ত সমাজপ্রক্রিয়া মনে করতে পারেন, বা নিজেকে বাংলা সাহিত্যের কালরেখার বাইরে মনে করতে পারেন, এই ধরণের ধারণাকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয়নি ওই চিন্তনতন্ত্রটি । বর্তমান কালখণ্ডে, আমরা জানি, একজন লোক লেখেন তার কারণ তিনি ‘লেখক হতে চান’ । অথচ লেখক হতে চান না এরকম লোকও তো লেখালিখি করতে পারেন । তাঁরা সাহিত্যসেবক অর্থে লেখক নন, আবার সাহিত্যচর্চাকারী বিশেষ স্হানাংক নির্ণয়-প্রয়াসী না-লেখকও নন । তাঁদের মনে লেখক হওয়া-হওয়ি বলে কোনও সাহিত্য-প্রক্রিয়া থাকে না ।

বহুকাল যাবৎ বিভিন্ন আলোচককে মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, উপন্যাস আর্ট ফর্মটির বঙ্গীয়করণ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, ছোটোগল্প আর্টফর্মটিকে সম্পূর্ণ দেশজ করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সনেট-তের্জারিমা-ভিলানেলকে এতদ্দেশীয় করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী ইত্যাদি ।  এই যে একটি ভিন্ন ভাষসাহিত্যের সংরূপকে আরেকটি ভাষাসাহিত্যে এনে সংস্হাপন, এর জন্য দ্বিভাষী দক্ষতা এবং সংরূপটি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানই যথেষ্ট নয় । যিনি এই কাজটিতে লিপ্ত, তাঁর গ্রাহীক্ষমতা, বহনক্ষমতা ও প্রতিস্হাপন ক্ষমতা থাকা দরকার। অমন ক্ষমতা গড়ে ওঠে জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে । আর এই জ্ঞান আহরণ তখনই সম্ভব যখন আ্হরণকারীর লেখক-প্রতিস্বের নির্মাণ ঘটে জ্ঞানটির পরিমণ্ডলে ।

অনির্মিত লেখক-একককে ব্র্যাণ্ডার ম্যাথিউজ প্রণীত ছোটোগল্পের সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা যাক । ‘দি ফিলজফি অফ দি শর্ট স্টোরি’ বইতে ম্যাথিউজ বলেছেন, “যাহা কেবলমাত্র গল্প এবং পরিসরে ক্ষুদ্র, তাহাই ছোটোগল্প নহে । ভাবের ঐক্য ছোটোগল্পের পক্ষে অপরিহার্য এবং এইখানেই উপন্যাসের সহিত ইআর পপধান প্রভেদ । ছোটোগল্পে ভাবের ঐকভ আছে, উপন্যাসে নাই ।  ক্ল্যাসিকাল ফরাসি নাটকের তিনটি ঐক্যই ফরাসি নাটকে আছে ; ইহা একটি ক্ষেত্রে, একটি দিনে, বিশেষ একটি ঘটনা দেখায় । ছোটোগল্পে একটিমাত্র চরিত্র, ঘটনা বা ভাব থাকে, অথবা একটিমাত্র পরিস্হিতির পটভূমিকায় কতকগুলো ভাবের সমাবেশ ঘটে।” এখন, অনির্মিত লেখক-প্রতিস্বের কাছে ‘ভাবের ঐক্য’, ‘ভাবের সমাবেশ’ ‘ক্লসিকাল ফরাসি নাটক’ ইত্যাদি ভাবকল্পগুলো দুর্ভেদ্য থেকে যাবে, এবং ব্যাখ্যার পরও বিমূর্ততা কাটবে না ।

   ‘অ্যান ইনট্রোডাকশান টু দি স্টাডি অফ লিটারেচার’ বইতে দেয়া ডাবলু. এইচ. হাডসন-এর তৈরি অনুশাসনের প্রেক্ষিতেও ব্যাপারটা বিচার করা যেতে পারে । হাডসন বলেছেন, “ছোটোগল্পে শিল্পকলার মূল্য নির্ধারণের জন্য ‘একক উদ্দেশ্য ও ভাবের ঐক্য’ বজায় আছে কিনা তা দেখা উচিত।” এখানেও প্রশ্ন উঠবে ‘শিল্পকলা’, তার ‘মূল্য নির্ধারণ’ এবং ‘একক উদ্দেশ্য’ ভাবকল্পগুলো নিয়ে । বস্তুত যে চিন্তনতন্ত্রের কথা একটু আগে বলেছি, তার সরবরাহ করা সংজ্ঞায় খাপ খায়নি বলে পূর্ণচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখা ‘মধুমতী’ রচনাটিকে সার্থক ছোটোগল্পের তকমা দেয়া হয়নি । সার্থক ছোটোগল্পের তকমা দেয়া হল ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘দেনাপাওনা’ রচনাটিকে । ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে গভীরভাবে বুঝতে না পারলে ‘সার্থক’ ছোটোগল্প লেখা সম্ভব ছিল না । সার্থকতা নামের মানদন্ডটি ওই চিন্তনতন্ত্রের ফসল । বর্তমান কালখণ্ডে ওই চিন্তনতন্ত্র বাতিল হয়ে গেছে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ ।

ওপরের কথাগুলো এইজন্য বলতে হল যে অবনী ধর, যাঁর চোদ্দটি গদ্য নিয়ে ‘ওয়ান সট’ বইটি  প্রকাশিত হয়েছিল, তিনি ছোটোগল্প-লেখক বা গল্পকার হওয়া-হওয়ি অবস্হান থেকে সেগুলো লেখেননি, এবং তাঁর লেখক-প্রতিস্বটি ছিল অনির্মিত । ১৯৬৯ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত, এই কালখণ্ডে তিনি এও চোদ্দটি গদ্যই লিখেছিলেন। ১৯৭৫ সালের পর তিনি লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিলেন । হাংরি আন্দোলনের সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল, অশোকনগরে, কিন্তু তখনও তিনি লেখালিখি আরম্ভ করেননি, যদিও তিনি নিজের জীবনের এই ঘটনাগুলো শোনাতে ভালোবাসতেন । তাঁর কথনভঙ্গিমা ও জীবননাট্যের ঘটনা থেকে স্পষ্ট ছিল যে কথাবস্তুর পরিসরটি সেই সময়ের সাহিত্যিক ডিসকোর্স এবং কাউন্টার-ডিসকোর্স থেকে একেবারে আলাদা, এমনকী হাংরি আন্দোলনের গল্পকার-ঔপন্যাসিক থেকেও আলাদা । ১৯৯৪ সালে কলকাতায় ফিরে জানতে পারি যে অবনী ধরের রচনাগুলো নিয়ে বই বের করার উৎসাহ কোনও হাংরি আন্দোলনকারী দেখাননি । আমি শর্মী পাণ্ডেকে অনুরোধ করি যে অবনী ধরের গদ্যগুলো নিয়ে একটা সংগ্রহ ওদের শিলালিপী প্রকাশনী থেকে বের করতে । শর্মী আর ওর স্বামী শুভঙ্কর দাশ তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যায় আর আমাকে একটা ভূমিকা লিখে দিতে বলে । এই সময়ে অবনী ধরের সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ ঘটে আর ওনার জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ফেলি । অবনী ধর বইটার নাম রেখেছিলেন ‘ওয়ান শট’, কিন্তু প্রচ্ছদ আঁকার সময়ে তা ‘ওয়ান সট’ হয়ে যায় ।

অবনী ধর জন্মেছিলেন ১৯৩৪ সালে, তখনকার পূর্ববঙ্গের মাদারিপুর জেলার কালাকিনি থানার পাঙাশিয়া গ্রামে. তাঁর মামার বাড়িতে । মারা যান ২০০৭ সালে, অশোকনগরে । তাঁর বাবা বঙ্কিমচন্দ্র ধর ( ১৯০৫ ) ওই জেলার মাইচপাড়া গ্রামের নিবাসী ছিলেন, সাত ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট ; বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন, কিন্তু কখনও কোনও চাকরি বা ব্যবসা করেননি ; স্বাদেশী আন্দোলনে যোগ দেবার কারণে কয়েকমাসের জেল হয়েছিল তাঁর । বঙ্কিমচন্দ্র তখনকার দিনের ম্যাট্রিক পাশ ছিলেন, অর্থাৎ যে চিন্তনতন্ত্রের কথা একটু আগে বলেছি, তার মননবিশ্বে অবনী ধরের প্রতিস্বনির্মাণের সুযোগটি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল, বিশেষ করে অবনী ধর যখন তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ।

অবনী ধরের বয়স যখন এক বছর, তখন তাঁর বাবা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে, তাঁর মা লাবণ্য ধর ( ১৯১৫ – ১৯৭৭ ) , আর ঠাকুমাকে নিজেদের ভাগ্যের ওপরে ছেড়ে দিয়ে, অন্য এক তরুণীর সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, এবং বাকি জীবন বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর সঙ্গিনী বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরূপে ভিক্ষা করে চালিয়েছিলেন । যদিও বঙ্কিমচন্দ্র মারা যান ১৯৬২ সালে, তাঁর মৃত্যুর খবর অবনীরা পান ১৯৭২ সালে । ততোদিন তাঁর মা শাঁখা-সিঁদুর পরতেন । অবনী ধরের লেখক-প্রতিস্ব প্রাগুক্ত চিন্তনতন্ত্রের  পরিসরে যদি গড়ে উঠত, তাহলে তিনি এই ট্র্যাজেডির মুহূর্তটি নিয়ে একটি কথাবস্তু তৈরি করতে পারতেন, কেননা ইউরোপীয় সাহিত্যে গ্রিসের সময় থেকে ব্যক্তি-এককের ট্র্যাজেডিটি লেখকত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান ছিল, যা খ্রিস্টের নৃশংস হত্যা ও আত্মবলিদানের প্রতীকি অতিকথার প্রচার-প্রসারের কারণে সাহিত্যের নন্দনক্ষেত্রটিকে দখল করে নিতে পেরেছিল । তাছাড়া বাইবেলোক্ত “আরিজিনাল সিন” বা প্রথম পাপের পতনযন্ত্রণাকে সর্বজনীন নৈতিক-দার্শনিক বনেদে পালটে ফেলার জন্যেও জরুরি ছিল ইউরোপীয় সাহিত্যের পাতায় পাতায় ব্যক্তি-ট্র্যাজেডির উপস্হিতি ।

অবনী ধরের জীবনে বহুবার বহুরকম ট্র্যাজেডি সংঘটন দেখা গেছে, কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতার সরাসরি মালিকানা সত্তেও তিনি সংঘটন-মুহূর্ত বা ক্লাইম্যক্স বা হুইপক্র্যাক এনডিং প্রয়োগ করে কথাবস্তুকে ঔপনিবেশিক সাহিত্য-অনুশাসন ও হেলেনিক মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত করেননি । প্রকৃত প্রস্তাবে কথাবস্তুগুলো গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক সাহিত্য-মূল্যবোধের আওতার বাইরে । প্রসঙ্গত, যে সময়ে অবনী ধর তাঁর প্রথম পর্বের গদ্যগুলো লিখেছিলেন, সেসময়ে মান্যতাপ্রাপ্ত বাংলা ছোটো গল্পকাররা ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুশাসন মোতাবেক, বিষণ্ণতা, পারক্য, প্রেমের বিকার, মৃত্যুপ্রবণতা, নিঃসঙ্গতার বেদনা,শহুরে যৌনতা ইত্যাদির চর্চা করছিলেন ।

বাবা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের একা ফেলে নিরুদ্দেশ হবার কারণে বছর পাঁচেক অন্নকষ্টে ভোগার পর তখনকার বিহারে ( এখন ঝাড়খণ্ড ) মধুপুরনিবাসী অবনীর ‘বুড়োমা’ অর্থাৎ তাঁর ঠাকুর্দার ভাইয়ের স্ত্রী, অবনী ও তাঁর মাকে দেখাসোনার জন্য, ও নিজের বার্ধক্যে দেখভালের জন্য, সেখানে নিয়ে গেলেন । যদিও অবনীর জ্যাঠামশাবরা, প্রথম দুজন ডাক্তার, ততীয়জন উকিল, চতুর্থজন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ যথাক্রমে দেওঘর ও মধুপুরে আশ্রম বসিয়ে তার মোহন্ত ছিলেন, অবনীর পড়াশুনার এবং স্কুলে ভর্তি হবার সুরাহা হলো না । বুড়োমার আশ্রয়ে অবনী ও তাঁর মায়ের অন্ন সমস্যার সমাধান হলেও, শিক্ষাপ্রাপ্তির সুযোগ ঘটল না । স্কুলে ভর্তির জন্য অবনীকে কলকাতার চেতলায় মামারবাড়ি যেতে হলো । প্রবাদবাক্যের মামার বাড়ির আবদারের বদলে অহরহ দুর্ব্যাবহার জোটায়, ১৯৫০ সালের পয়লা অক্টোবর, কাউকে না জানিয়ে, স্কুল থেকে পালিয়ে, অবনী চলে গেলেন মার্চেন্ট নেভিতে, খালাসির কাজ নিয়ে । তখন তাঁর ষোলো বছর বয়স ।

এই সময়ের অভিজ্ঞতাগুলো অবনী সংগ্রহ করেন জাহাজে খালাসির কাজ করার সময়ে, বিভিন্ন দেশের বন্দর-শহরে, ইউরোপ তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাঙন কাটিয়ে উঠতে পারেনি । বস্তুত তাঁর খালাসিপর্বের কথাবস্তুগুলো, কথনভঙ্গীর অন্তর্গত আহ্লাদময়তার কারণে, সুখশ্রাব্য ও কৌতূহলোদ্দীপক ছিল, যে গল্পগুলো বাসুদেব দাশগুপ্তকে তিনি শোনাতেন । অনেকে মনে করেন বাসুদেব দাশগুপ্তের গল্পগুলোর উৎস হলো অবনী ধরের অভিজ্ঞতা । লেখালিখি না করেও অবনী ধর তাঁর জীবনযাপনের কারণে নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করতেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খালাসিটোলায় ঢুঁ মারতেন । বাসুদেব দাশগুপ্ত ও শৈলেশ্বর ঘোষের প্ররোচনায় সোনাগাছির যৌনকর্মী বেবি, মীরা এবং দীপ্তির সঙ্গে নৈকট্য গড়ে ফেলেছিলেন ।

হাংরি আন্দোলনের সময়ে, উৎসাহদানকারী সম্পাদক ও স্তাবকদলের অভাবে, এবং অবনী ধরের সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খার অনুপস্হিতিতে, তাঁর বলা কাহিনিগুলো লিখিত পাঠবস্তুর আকার নিতে পারেনি । জরুরি অবস্হার শেষে সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোরণ ঘটলেও, সম্পাদকরা অবনীর গদ্য সম্পর্কে আগ্রহী হননি, মূলত তাঁর কথনভঙ্গীর ও রচনাকাঠামো বিদ্যায়তনিক সংরূপ বহির্ভূত ছিল বলে । একজন খালাসির গদ্যসন্দর্ভে যে যাযাবরতার নিবাস, যার উপকরণগুলো যাত্রাপথের খুদে অনির্ণেয়তায় তাৎপর্যময়, যার বিন্যাসে ভাসমান পরিভ্রমণের অনুন্মোচিত বাচন, স্নায়ুভাষায় রচিত সেরকম স্বতঃজাত কৃৎপ্রকরণ, স্বীকৃতি পায়নি লিটল ম্যাগাজিন স্তরেও । যেহেতু অবনীর পাঠবস্তু আত্মমগ্নতাকে অতিক্রম করে যায়, এবং তাঁর বাকব্যঞ্জনা বদ্ধসমাপ্তির কাঠামোটাকেই উপহাস করে, প্রধাগত আলোচকদের দৃষ্টিও তিনি আকর্ষণ করতে পারেননি ।

অবনীর ও তাঁর আত্মীয় পরিজনের পরিবারে নিরুদ্দিষ্ট, সাধু, সন্ন্যাসী, মোহন্ত, ভিখারি-বৈষ্ণব, বাউল ইত্যাদির পূর্বেতিহাস থাকার কারণে অবনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মা চিন্তিত ছিলেন । বয়ঃসন্ধি অতিক্রান্ত সন্ধিক্ষণে তাঁর ছেলে হয়তো কোনও বন্দরশহর থেকে বিদেশিনী বিয়ে করে বা না-করে সঙ্গে এনে একদিন হাজির হবেন, এমন দুশ্চিন্তাও লাবণ্য ধরের ছিল । ছেলের চরিত্রে অভিজ্ঞতাজনিত পার্থক্যও তিনি লক্ষ্য করে থাকবেন । তিনি অবনীকে বললেন জাহাজের চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসতে । খালাসির চাকরি ছেড়ে ১৯৫৫ সালে ফিরে এলেন অবনী ।  বুড়োমা মারা যেতে তাঁর মা মধুপুরে একা হয়ে পড়েছিলেন । অবনী দেশে ফিরে চেতলার একটা বস্তিঘরে, মামার বাড়ির কাছে, বাসা ভাড়া নিয়ে মাকে মধুপুর থেকে নিয়ে এলেন । ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩, এই আট বছর টাকা রোজগারের জন্য নানা রকম জীবিকার অভিজ্ঞতা হলো অবনীর — ক্রেন-ড্রেজার-ডাম্পার অপারেটার, লরি-ট্যাকসি-প্রায়ভেট মোটরগাড়ি চালক, রেলওয়ে ক্যাটারিঙের বেয়ারা, কোককয়লা ফেরি, ঠোঙা ও প্যাকেট তৈরি, পোস্টার-ফেস্টুন লেখা ইত্যাদি, অসংগঠিত শ্রমিকের জন্য যে-ধরণের কাজ পাওয়া যায় সবই করলেন । ১৯৬২ সালে অবনীর মা পাত্রী নির্বাচন করে সাধনার সঙ্গে তাঁর বি্য়ে দেন ।

অবনী তাঁর সংসার ইতিমধ্যে চেতলা থেকে নতুন গড়ে-ওঠা উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কলোনি অশোকনগরে তুলে নিয়ে যান । তখন সেখানে স্হানীয় স্বায়ত্বশাসনের পরিকাঠামো বিশেষ ছিল না । তিনি নবতর অভিজ্ঞতার সামনে পড়লেন অশোকনগরে । তিনি এও দেখলেন যে, যাঁদের মাঝে তিনি বসবাস করতে এলেন, তাঁরা পপতিদিনকার মূর্ত নাগরিক অসুবিধা ও জাগতিক দুঃখকষ্টে ও অভাব প্রতিকারের বদলে সোভিয়েত রাষ্ট্র, চিন, ভিয়েৎনাম, কিউবা, আমেরিকা, দিল্লী ইত্যাদি সুদূরবর্তী বিমূর্ত অদরকারি তর্কাতর্কিতে সময় ও ক্ষমতা অপচয় অপচয় করে আনন্দ পান । অর্থাৎ সুপ্রাইণ্ডিভিজুয়াল বা অধিব্যক্তিক ম্যাক্রোলেভেল ভাবুকদের পশ্চিমবাংলার মাটিপৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন তৎপরতার প্রেক্ষিতে, তাঁর মাইক্রোলেভেল খালাসিত্ব তাঁকে কল্যাণকামীতার স্বাভাবিক সনাতন মূল্যবোধে হায়ারার্কিবর্জিত করে রেখেছিল, এবং সেই ভূমিজ প্রবৃত্তিকে অবনী ধর কাজে লাগালেন ।

তিনি এবং আরও কয়েকজন মিলে, বিশেষ করে শিক্ষক সমর ঘোষ, অশোকনগরে ডাকঘর বসানো, পৌরসভা গঠন, অসামাজিক কাজকারবার বন্ধ ইত্যাদির উদ্যোগ নিলেন । উদ্যোগটিকে কন্ঠস্বর দেবার জন্য, এবং তাঁদের অভাব-অভিযোগ যাতে কর্তাব্যক্তিদের কানে পৌঁছোয়, ১৯৬৪ সালে পপকাশ করা আরম্ভ করলেন ‘অশোকনগর বার্তা’ নামে একটি পাক্ষিক সংবাদপত্র, যেটি ছিল ওই অঞ্চলের প্রথম পঞ্জিকৃত সংবাদপত্র । পত্রিকাটির আয়ু ছিল তিন বছর, সম্ভবত যথেষ্ট । পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, নিজের অভিজ্ঞতাকে কথাবস্তুতে রূপান্তরিত করে ছাপাবার কথা তাঁর মনে আসেনি কখনও ; পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত অন্যেরাও তাঁর মুখে ঘটনা শুনেও তাঁকে লিখতে বলেননি । সম্ভবত সমাজচিন্তনকে আত্মসাৎ করে ব্যক্তি-ক্রিয়াকরণের চিন্তা-পরিসর লালিত হবার মতো পৃথকত্ববোধ জাগার সুযোগ বা মনস্হিতি তাঁর হয়নি । ১৯৬৩ সাল থেকে চাকুরিহীন অবনীর কাছে আপনা থেকেই পরিত্যক্ত হয়েছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দর্শন ।

অবনী ধরের কথাবস্তুগুলোকে দুটি পর্বে চি্‌হ্ণিত করা যায় । প্রথম পর্বটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্বটি ২০০০ সালের পর । মাঝে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন । প্রথম পর্বে তিনি ছিলেন অর্থস্রোতহীন এবং কোনও সাহিত্যিক স্বকীয়তা আনার প্রয়াস করেননি । তা আপনা থেকে হয়ে গিয়েছিল তাঁর অনির্মিত লেখক-প্রতিস্বের কারণে । অবনী ধরের ডিসকোর্স, কখনও খালাসির, কখনও বা অসংগঠিত শ্রমিক বা কর্মহীনের, ভূপ্রকৃতির উথ্থানভূমিলব্ধ, স্হানিক, অবিমিশ্র, মুক্ত, যৌগিক, বর্ণিল, অনুভূমিক, প্রতিসংস্হাপিত, কৌমনিষ্ঠ এবং অতিজ্ঞাপনমূলক । প্রথম লেখাটি, ‘আমার দুঃখী মা’ রচনার পর তিনি তা লাবণ্য ধরকেই পড়ে শুনিয়েছিলেন । স্তম্ভিত মা কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর. বলেছিলেন, ‘সত্য কথাই ল্যাখছস।’

দ্বিতীয় পর্বের শুরু ২০০০ সালে । এই পর্বে অবনীর গদ্য-কাঠামোয় কয়েকটি কারণে সাইত্যিকতা এসে গেছে । তাঁর স্ত্রী, আরও কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে একজোট হয়ে মামলা করে ১৯৯০ সালে চাকরি পাবার পর অবনীর আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটে । তাঁর মেয়ে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও বি এড এবং ছেলে বি এ পাশ করেন । অর্থাৎ প্রথম পর্বের জ্ঞান পরিমণ্ডলটি, তাঁর মেয়ে ও ছেলের প্রভাবে ক্রমশ অপসারিত হয়ে বাড়ির মধ্যে একটি ভিন্ন, যা অবনীর কাছে তুলনামূলকভাবে উচ্চতর ঠেকে থাকবে, জ্ঞানপরিমণ্ডলের প্রবেশ ঘটিয়েছে । তৃতীয়ত, তাঁর প্রথম পর্বের রচনাগুলো, অন্তত কিছু সাহিত্যপাঠকের, হাতে গোনা হলেও, দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে, যাঁদের পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় তিনি উৎসাহিত হয়ে থাকবেন গদ্যগুলোকে একটি সাহিত্যিক আদল-আদরা দেবার । দ্বিতীয় পর্বের কথাবস্তুগুলোর গদ্যবিন্যাসে ধরা পড়ে যে প্রথাবাহিত গদ্যসাহিত্যের সঙ্গে, যেগুলো তাঁর ছেলে-মেয়ে নিজেরা পড়ার জন্য বাড়িতে এনে থাকবেন, তাঁর যোগাযোগ ঘটেছে । অবনী নিজে চেষ্টা করলেও, এই বয়সে পৌঁছে, তাঁর পক্ষে মুকুরবিম্ব গড়া সম্ভবপর হয়নি, এবং তাঁর অপরত্ববোধ ও সাহিত্যিক অপরত্ব মুছে যায়নি । প্রথম ও দ্বিতীয়, দুটি পর্বেই, তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা তাড়িত হয়েছে অপরত্ববোধের অবস্হাননজনিত  বিপর্যয় দ্বারা। আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিকের কথাবস্তুতে, অপরত্ববোধের মাত্রাগুলোকে, অবনীর মতো করে ইতোপূর্বে উপস্হাপন করতে দেখা যায়নি । তাঁর মস্তিষ্কে আতিথ্য নেয়া কথাকারটি নিজেরই স্মৃতির ঐতিহাসিক হিসেবে অবনীর সামনে উদয় হয়েছে কখনও-সখনও, যিনি অতীতকে বাঁচিয়ে তুলতে চেষ্টা করছেন না বা অতীতে বেঁচে থাকার কথা বলছেন না ; আসলে কথাকার ওই দূরবর্তী এবং নিকট অতীতের লোপাট হয়ে যাওয়া ও তাকে বাগে আনার বাচনক্রীড়ায় অংশগ্রহণকারীরূপে ‘অপর প্রতিসন্দর্ভের’ সতর্কতাগুলো জাহির করছেন ।

অবনীর বইটি যদি আরেকবার প্রকাশ করা হয়, তাহলে গদ্যগুলোকে প্রকাশকাল অনুযায়ী সাজিয়ে নিলে ভালো হয় । সেই সঙ্গে বইয়ের নামটাও শুধরে নিতে হবে ; ‘ওয়ান সট’ এর পরিবর্তে ‘ওয়ান শট’ করে দিতে হবে।

 

 

 

জুলিয়েট রেনোল্ডস : ছবি আঁকা, হাংরিয়ালিজম ও বিট আন্দোলন

 

23316477_10214564022917298_5659231321363037787_n

         দুটি আন্দোলনেই, কবি ও লেখকদের সংখ্যাধিক্যের কারণে, বেশ কম লোককেই পাওয়া যাবে যিনি তর্ক জুড়বেন যে বিট আন্দোলন এবং হাংরি আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে ছিল সাহিত্যের আন্দোলন । দুটি আন্দোলনই ডাডাবাদীদের সঙ্গে তাঁদের তুলনাকে আকৃষ্ট করলেও, কেউই এই দুটিকে শিল্পের আন্দোলন বলতে চাইবেন না, যা কিনা ডাডা আন্দোলনকে বলা হয়, তাঁদের গোষ্ঠীতে সাহিত্যিকরা থাকলেও ।

কিন্তু বিট এবং হাংরিয়ালিস্টদের ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে যদি খুটিয়ে দেখা হয় তাহলে সন্দেহ থাকে না যে যেমনটা আলোচকরা মনে করেন তার চেয়ে অনেকাংশে বেশি ছিল শিল্পীদের অবদান এই দুটি আন্দোলনে। বিট আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিশ্লেষণেই তা সত্য বলে প্রমাণিত হয় । তাঁদের আন্দোলনে শিল্পের যে স্হির-নিবদ্ধ সন্দর্ভ প্রধম থেকে ছিল তা কখনও থামেনি । অবশ্য মনে রাখতে হবে যে বিটদের সম্পর্কে তথ্যাদি ভালোভাবে নথি করা হয়েছে, যা হাংরি আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে হয়নি, ব্যাপারটা প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের ফাটলের অবদান । বিট আন্দোলন কাউন্টার কালচার হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে উদয় হয়েছিল, যখন কিনা হাংরি আন্দোলন তার কায়া পেয়েছিল দরিদ্র, অবিকশিত একটি দেশে, তাও তারা সীমিত ছিল একটি রাজ্যে বা এলাকায় । তাছাড়াও, হাংরি আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিকভাবে এমন করে দাবিয়ে দেয়া হয়েছিল যা বিটনিকদের ক্ষেত্রে একেবারেই ঘটেনি । গিন্সবার্গ, ফেরলিংঘেট্টি, কোরসো, বারোজ এবং বাকি সবাই তাঁদের কুখ্যাতিকে নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে পেরেছিলেন, তাঁরা তা না চাইলেও পেরেছিলেন । এর ফলে তাঁদের আন্দোলন বহুকাল টিকে থাকতে পেরেছিল এবং লতায় পাতায় বেড়ে উঠতে পেরেছিল, জনমানসে কাল্ট হিসাবে স্হান করে নিতে পেরেছিল ।

অপরপক্ষে, ১৯৬১ সালে মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমীর রায়চৌধুরী ও দেবী রায় যে আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তা কয়েক বছরের মধ্যেই সরকারি লাঠিচালনা ও নিজেদের মধ্যে অবনিবনার কারণে স্তিমিত হয়ে যায়, অবনিবনার কারণ ছিল সরকারের লোকেদের দ্বারা আন্দোলনকারীদের হয়রানি ও নাকাল করার চাপ । অশ্লীলতার আরোপে মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা ও পরে মলয়ের জেলজরিমানা ছিল হাংরি আন্দোলন ভেঙে ফেলার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিকল্পনা । তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে প্রত্যেক সদস্যের বাড়িতে নির্মম পুলিশি হানা দিয়ে বৌদ্ধিক ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, বই, পাণ্ডুলিপি এবং চিঠিপত্র ।

হাংরি আন্দোলনের শিল্পীদের ক্ষেত্রে, বেনারসে, অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় এবং সহযোগী শিল্পীদের ‘ডেভিলস ওয়র্কশপ’ নামে স্টুডিও তছনছ করে দিয়েছিল পুলিশ, নষ্ট করে দিয়েছিল তাঁদের আঁকা পেইইনটিঙ, আন্দোলনের নথিপত্র, যা পরে আর ফেরত পাওয়া যায়নি । সৌভাগ্যবশত অনিল করঞ্জাইয়ের কিছু কাজ, হাংরি আন্দোলনের লাগোয়া সময়ের, সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল এবং তাঁর সংগ্রহের দুর্মূল্য সম্পদ হিসাবে সংরক্ষণ করা গেছে, যেগুলোয় পাওয়া যাবে হাংরি আন্দোলনের আইডিয়া এবং উদ্বেগ । এগুলো থেকে হাংরি আন্দোলনকে আরও গভীর ভাবে বোঝা যায় । এটা বলা ক্লিশে হবে না যে শব্দাবলীর তুলনায় উদ্দেশ্যকে ছবি আরও স্পষ্ট করে মেলে ধরতে পারে। অনিল করঞ্জাই ( ১৯৪০ – ২০০১ ) ছিলেন হাংরি আন্দোলনের প্রতি সমর্পিত একমাত্র শিল্পী । একই ধরণের বিট চিত্রশিল্পী ছিলেন রবার্ট লাভাইন ( ১৯২৮ – ২০১৪ )। অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছেন যে বিট আন্দোলনের জন্ম দেয়ায় রবার্টের বেশ বড়ো অবদান আছে । রবার্টের সান ফ্রানসিসকোর বিশাল বাড়িতে বোহামিয়ান, পোশাকহীন, বুনো তরুণ-তরুণী বিট আন্দোলনকারীরা সবাই মিলে বিট আন্দোলনকে চরিত্র দিয়েছিলেন । বিট আন্দোলনের গ্রাফিক্স আর পোস্টার এঁকে দিতেন রবার্ট। অনিল এবং করুণাও হাংরি আন্দোলনে একই কাজ করতেন ।

গিন্সবার্গ এবং রবার্ট নিজেদের মধ্যে নান্দনিক ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতেন । তাঁরা দুজনেই আণবিক কাখণ্ডে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত যুবসমাজের চেতনায় প্রতিফলিত অবক্ষয় ও মৃত্যুবোধকে নিজেদের কাজে প্রতিফলিত করতে চাইতেন, রবার্ট লাভাইনের কথায়, “স্হায়ীত্বের মিথ্যা” সম্পর্কে তিনি গিন্সবার্গের থেকে জেনেছিলেন । যে জগতের ভবিষ্যৎ নেই সেখানে স্হায়ী শিল্পকর্মের ধারণা তাঁকে অবশ করে দিয়েছিল, যা থেকে তাঁর মুক্তি পাওয়া অসম্ভব ছিল যদি না তিনি বিটনিকদের সংস্পর্শে আসতেন । ‘পাগল, ল্যাংটো কবি’ হিসাবে লোকে গিন্সবার্গকে জানতো, এবং রবার্টকে গিন্সবার্গ বলেছিলেন ‘মহান উলঙ্গ শিল্পী’, দুজনেই সহকর্মী ও বন্ধুদের চরিত্র তুলে ধরেছিলেন নিজের নিজের কাজে, প্রথমজন জ্বলন্ত ‘হাউল’ কবিতায় এবং দ্বিতীয়জন তাঁর রেখা ও রঙে । তাঁর আঁকা যুবক গিন্সবার্গের অয়েলপেইন্ট ব্যাপারটাকে বিশদ করে তুলেছে ।

বিটদের তুলনায় অনিল করঞ্জাই পোরট্রেট আঁকা বেশ দেরিতে আরম্ভ করেন । স্টাইলের দিক থেকেই আর্টিস্ট দুজন ভিন্ন, কিন্তু তাঁদের আঁকা বেশ কিছু পোরট্রেটে পাওয়া যাবে ব্যক্তিবিষয়ের কোমলতা । এটা অনিলের ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে করুণার বাচ্চা মেয়ের চারকোল স্কেচে, যে বাচ্চাটাকে অনিল জন্মের সময় থেকেই জানতো, আর হাংরি আন্দোলনকারীদের ম্যাসকট হয়ে উঠেছিল ।

রবার্ট লাভাইন, প্রেমে গিন্সবার্গের প্রতিদ্বন্দ্বী, পিটার অরলভস্কির যে বিরাট পেইনটিঙ এঁকেছিলেন, সেইটিই ছিল গিন্সবার্গের সবচেয়ে প্রিয় ছবি । উলঙ্গ, সুন্নৎ না-করা লিঙ্গ যৌনচুলে ঢাকা, ছবিটা যৌনতা উত্তেজক হলেও দুঃখি আর বিষণ্ণ । গিন্সবার্গ লিখেছেন যে তিনি পিটার অরলভস্কির সঙ্গে পরিচয়ের আগে ছবিটা যখন দেখেছিলেন তখন ‘চোখের দিকে তাকিয়ে প্রেমে বিদ্যুৎপৃষ্ট বোধ করেছিলেন।’ সেই সময়কার মানদণ্ড অনুযায়ী গিন্সবার্গ এবং লাভাইন দুজনেই ছিলেন পর্নোগ্রাফার । কিন্তু কবির তুলনায় শিল্পী বেঁচে গিয়েছিলেন আদালতের হয়রানি থেকে, বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কেননা সত্তর দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সামনাসামনি নগ্নতা এবং সমকামকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করা হতো । রবার্ট লাভাইনের মতো অনিল করঞ্জাইও নগ্নিকা এঁকেছিলেন এবং আদালতের চোখরাঙানি পোহাতে হয়নি । কিন্তু অনিলের ‘ক্লাউডস ইন দি মুনলাইট ( ১৯৭০ ) রোমা্টিক ক্যানভাসে বিট পেইনটারের তুলনায় অনিলকে ভিশানারি বলে মনে হয় ।

প্রখ্যাত কবি এবং ‘সিটি লাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, যাঁকে ‘হাউল’ প্রকাশ করার জন্য অশ্লীলতার আরোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং যিনি হাংরি আন্দোলনকারীদের মামলার সময়ে হাংরিয়ালিস্টদের রচনা প্রকাশ করেছিলেন, নিজেও শিল্পী ছিলেন । ফেরলিংঘেট্টির এক্সপ্রেশানিস্ট দৃশ্যাবলী, প্রথম দিকে বিমূর্ত, পরে ফিগারেটিভ এবং প্রায়ই সরাসরি রাজনৈতিক — দর্শকদের নাড়া দেয় এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী হিসাবে তাঁর গুরুত্ব বৃদ্ধি করে ।

‘নেকেড লাঞ্চ’ গ্রন্হের লেখক উইলিয়াম বারোজ, যাঁকে আইনের ফাঁদে পড়তে হয়েছিল, বিট জেনারেশনের একজন নামকরা সদস্য, তিনিও ছিলেন ভিশুয়াল আর্টিস্ট । কিন্তু বারোজের পেইনটিঙ এবং ভাস্কর্য প্রকৃতপক্ষে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী । তিনি অনেক সময়ে নিজের মনের গভীরতাকে তুলে ধরার জন্য চোখ বন্ধ করে আঁকতেন, যাগুলো হতো উন্মাদগ্রস্ত, কেবল কড়া মাদক সেবনের এবং অযাচারী যৌনতার ফলেই নয়। বেশ কিছু ক্যানভাসে বুলেটের ছ্যাঁদা আছে, তাঁর দর্শকদের জানাবার জন্য যে উইলিয়াম টেলের মতন গুলি চালাতে গেলে তিনি নিজের স্ত্রীকে খুন করেছিলেন, স্ত্রীর মাথাকে খেলার বল মনে করে । বারোজকে বলা হতো ‘পাঙ্ক’-এর পিতা, পরে ‘পপ শিল্পের পিতা’ অ্যাণ্ডি ওয়ারহল-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন এবং দুজনে একত্র হলে আমোদ করতেন । অ্যাণ্ডি ওয়ারহল বন্দুকের ব্যাপার ভালোই জানতেন, যদিও তিনি ছিলেন আক্রান্ত, আক্রমণকারী নন । ‘দি ফ্যাক্টরি’ নামে খ্যাত ওয়ারহলের নিউ ইয়র্কের স্টুডিওতে বারোজ প্রায়ই যেতেন ।

প্রথম দিকে বিটদের বিমূর্ত এক্সপ্রেসানিস্ট পেইনটারদের সঙ্গে একাসনে বসানো হয়েছিল, যদিও বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিস্ট পেইনটাররা তাঁদের জীবনযাত্রায় বিটদের অচিরাচরিত ব্যক্তিগত জীবনের মতন ভবঘুরে ছিলেন না । তাঁরাও মিডিয়াকে ও দর্শকদের তাঁদের কাজের মাধ্যমে চমকে দেবার প্রয়াস করতেন । তাঁরাও, একইভাবে, প্রথানুগত আঁকার রীতিনীতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতেন । তার জন্য তাঁরা বিশাল বিশাল ক্যানভাসে দ্রুত তরল স্ট্রোক দিতেন ; একে তাঁরা বলতেন ‘অরগ্যাজমিক ফ্লো’, আর এই ‘অরগ্যাজমিক ফ্লো’ ছিল হাংরিয়ালিজমের মননবিন্দু । বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিস্ট পেইনটিঙকে এখন নৈরাজ্যবাদী মনে হতে পারে, যা বিট এবং হাংরি আন্দোলনের রচনাপদ্ধতিতে একই ধরনের ছিল বলা যেতে পারে, কিন্তু হাংরি পেইনটারদের শিল্পকলা ছিল সুচিন্তিত, তাঁদের কেঅস ছিল পরিকল্পিত ।

একজন শিল্পী উন্মাদের মতন অনিয়ন্ত্রিত আবেগে এঁকে চলেছেন ব্যাপারটা নিছক ক্লিশে, এবং কম সংখ্যক শিল্পীই অনিল করঞ্জাইয়ের মতন এই ব্যাপারটায় জোর দিয়েছেন । নিওফাইট হিসাবেও, অস্হির তেজোময়তা ও পরিপূর্ণ জোশে অনিল করঞ্জাই এঁকেছেন প্ররিশ্রমান্তিক সুচিন্তিত ক্যানভাস । হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থাকার কারণে, যাঁদের মধ্যে তাঁর বয়স ছিল সবচেয়ে কম, এই বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্ব পেয়েছে । যে একমাত্র শিল্পী তাঁকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, তিনি হলেন ডাচ শিল্পী হিয়েরোনিমাস বশ ( ১৪৫০ – ১৫১৬ ) । বশের গ্রটেস্ক বিদ্রুপাত্মক চিত্রকল্প অনিল করঞ্জাইকে অনুপ্রাণিত করত, যে সময়ে অনিল শ্রেণিবিভাজিত এবং শোষিত সমাজের একক ভিশন নিজের পেইনটিঙে গড়ে নেবার প্রয়াস করছিলেন । বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিজম সম্পর্কে অনিল বহু পরে জেনেছেন ।

সবচেয়ে কুখ্যাত বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিস্ট জ্যাকসন পোলক — ‘ফোঁটাগড়ানো জ্যাক’ — একজন ‘অ্যাকশান পেইনটার’, ক্যালিফর্নিয়ার ‘দি আমেরিকান মিউজিয়াম অভ বিট আর্ট’’-এ বহু শিল্পীর সঙ্গে স্হান পেয়েছেন । চরম ডাডাবাদী মার্সেল দুশঁও পেয়েছ, যিনি, বিটনিকরা জন্মাবার আগেই ‘অ্যান্টি-আর্ট’ শব্দবন্ধটির উদ্ভাবন করেছিলেন, এবং সেকারণে বিটদের আদর্শ । কিন্তু শোনা যায় যে পঞ্চাশের দশকে যখন অ্যালেন গিন্সবার্গ ও গ্রেগরি কোরসো প্যারিসে দুশঁর সঙ্গে দেখা করেন, দুজনে নেশায় এমন আচ্ছন্ন ছিলেন যে গিন্সবার্গ দুশঁর হাঁটুতে চুমুখান, আর কোরসো নিজের টাই কেটে ফ্যালেন । বয়স্ক দুশঁর তা পছন্দ হয়নি । বিটদের সেসময়ের আচরণ এমনই স্বার্থপরভাবে অসংযত ছিল যে তাঁরা অনেককে চটিয়ে দিতে সফল হয়েছিলেন, এমনকি জাঁ জেনেকেও, যাঁর আদবকায়দা মোটেই ভালো ছিল না ।

বেনারসে বসবাসের সময়ে অনিল করঞ্জাই ও অ্যালেন গিন্সবার্গের মাঝে ছবি আঁকার বিষয় নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা হয়েছিল বলে মনে হয় না । মার্কিন লোকটির আগ্রহ ছিল উচ্চতর ব্যাপারে প্রতি, অর্থাৎ সাধু, শ্মশানঘাট, মন্ত্র, গাঁজা ইত্যাদি । হিন্দি ভাষার বৌদ্ধ কবি নাগার্জুনের সঙ্গে অনিল ও করুণা অ্যালেন গিন্সবার্গকে হারমোনিয়ামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পাশাপাশি গিন্সবার্গ ও অরলভস্কিকে ছিলিম টানার কায়দা শিখিয়ে ছিলেন, যা প্রায় ধর্মাচরণের ব্যাপার এবং মোটেই সহজ নয় । এ ছাড়া হাংরি আন্দোলনকারীদের ছবি আঁকায় গিন্সবার্গ বিশেষ আগ্রহ দেখাননি । অনিলের খারাপ লাগেনি কেননা তাঁর বয়স তখন কম ছিল, আনন্দ পেয়েছিলেন ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পেয়ে, যা ভাষায় অনিল তখন অত সড়গড় ছিলেন না । অনিল আর করুণা দুজনেই খ্যাতিপ্রাপ্ত মার্কিন সাহেবকে বিশেষ পাত্তা দিতেন না, কিন্তু পরবর্তীকালে গিন্সবার্গের আমেরিকা কবিতার পঙক্তি চেঁচিয়ে অনিল বলতেন, “আমেরিকা তোমার ডিমগুলো কবে ভারতে পাঠাবে?”

সন্দেহ নেই যে গিন্সবার্গ রেসিস্ট ছিলেন না, অন্তত সচেতনতার স্তরে । কিন্তু তাঁর মধ্যে সাদা চামড়ার মানুষের ঔদ্ধত্য ছিল, যা অন্যান্য বিটদের মধ্যেও ছিল । প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন হওয়া সতবেও একটা স্তরে তা ছিল অত্যন্ত এলিটিস্ট । যেমন বারোজ, স্ত্রীকে খুন করার পরেও ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলেন, কেননা তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন এবং তাঁর পরিবার ছিল বৈভবশালী । গিন্সবার্গ ততোটা ধনী পরিবারের না হলেও বেশ কমবয়সেই সুপারস্টার হয়েগিয়েছিলেন । তিনি ভারতে এসে যতোই গরিব সেজে থাকুন, তা তাঁকে তাঁর মঞ্চ থেকে নামাতে পারেনি, তা ছাড়া ভারতে তিনি চামচাগিরির সুখও পেয়ে থাকবেন ।

সম্ভবত হাংরি আন্দোলনকারীরাই একমাত্র তাঁর সঙ্গে সমানে-সমানে আইডিয়া আদান-প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর কবিতায়  ও ভাবনাচিন্তায় হাংরি আন্দোলনকারীদের প্রভাব স্বীকার না করাটা তাঁর সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করে না ।

গিন্সবার্গ, যিনি ভারতের ধর্মে পরোক্ষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলে মনে হয়, হাংরি আন্দোলনকারীদের ধর্ম সম্পর্কিত ভাবনাচিন্তাকে গ্রহণ করতে পারেননি । হাংরি আন্দোলনকারীরা ঈশ্বরকে বিসর্জন দিয়েছিলেন আর যে কোনো ধরণের উপাসনা-অর্চনা সম্পর্কিত বিশ্বাসকে সমসাময়িক ভাষায় নিন্দা করেছেন । অনিলের শৈশব বেনারসে কাটার দরুন তিনি ছোটোবেলা থেকেই ধর্মে বিশ্বাস করতেন না ; তিনি মন্দিরের বয়স্কদের বারো বছর বয়স থেকেই চ্যালেঞ্জ করতেন, আর তাদের তর্কে হারিয়ে দিতেন হিন্দুধর্মের জ্ঞানের সাহায্যে । বিজ্ঞাননির্ভর মানসিকতা নিয়ে অনিল সারাজীবন আস্তিক ছিলেন । প্রথম দিকের বৌদ্ধধর্ম তাঁকে আকৃষ্ট করলেও অনিল তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সমালোচনা করতেন, আর শেষ জীবনে অ্যালেন গিন্সবার্গ এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হন । অবশ্য বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে বিট কবিদের যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির মিল ছিল, যেমনটা ছিল হাংরি আন্দোলনের অন্যান্য সদস্যদের ।

হাংরি আন্দোলনকারীদের রাজনীতির কথা যদি বলতে হয়, শেকড়পোঁতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবাই যেমন তীব্র আক্রমণ চালাতো তাকে অনিল করঞ্জাই সমর্থন করতেন, কিন্তু তাদের অ্যানার্কিজমকে মেনে নিতে পারেননি অনিল । হাংরি আন্দোলনকারীদের বক্তব্য যে মানবাস্তিত্ব হল রাজনীতিরও আগের এবং রাজনৈতিক মতাদর্শগুলোকে বর্জন করা দরকার, তাও মানতে পারেননি অনিল । অনিল কিছু দিনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু হাংরি আন্দোলনে যোগ দেবার আগেই  বেরিয়ে আসেন । তা সত্বেও অতিবামের দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল । হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার পরে তিনি নকশাল দলে যোগ দিয়েছিলেন, এই কথাটা সত্য নয় ।

এ কথা সত্য যে বেনারস ও কাঠমাণ্ডুতে হাংরি আন্দোলনকারীরা যৌথ যৌনতার অর্গিতে নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন, কিন্তু তা বিটদের যৌনজীবনের হইচইয়ের সামনে অত্যন্ত হালকা । অনিল এবং করুণা হিপি আর বিদেশি সাধক-সাধিকাদের সঙ্গে বেনারসে আন্তর্জাতিক কমিউনে  বসবাস করেছিলেন, এমনকি করুণা ছিলেন সেই কমিউনের ম্যানেজার ও মুখ্যরাঁধুনি । চেতনার বিস্তারের জন্য তাঁরা এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম ইত্যাদি মাদক নিয়ে পাঁচিল ঘেরা জায়গায় নীরক্ষা করতেন । অনিলের চেতনায় এর প্রগাঢ় প্রভাব পড়েছিল কেননা অনিল দায়িত্বহীনভাবে মাদক সেবন করতেন না, পজিটিভ থাকার প্রয়াস করতেন, পেইনটার হিসাবে ভিশানের বিস্তার ছিল তাঁর কাম্য । ‘ড্রাগ অ্যাবিউজ’ বলতে যা বোঝায় তার খপ্পরে তিনি পড়েননি ।

হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের পেইনটিঙ ইচ্ছে করে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, এটাও বাড়িয়ে-চাড়িয়ে তৈরি করা গালগল্প, ১৯৬৭ সালে কাঠমাণ্ডুর বিখ্যাত একটি গ্যালারিতে প্রদর্শনীর শেষে এই সমস্ত ব্যাপার ঘটেছিল বলে প্রচার করা হয় । লেখকদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যাতে মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের  কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ করা হয়েছিল । করুণা তার যাবতীয় পেইনটিঙ পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলেছিলেন । অনিল করঞ্জাই একপাশে দাঁড়িয়ে মজা উপভোগ করেছিলেন । অমন শিল্পবিরোধী কাজ তাঁর মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায়নি । অনিলের আইকনোক্লাজম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের ।

হাংরি আন্দোলনকারীদের মতাদর্শের সঙ্গে তাঁর কিছুটা অমিল থাকলেও, হাংরির নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে দিয়েছিলেন অনিল । ষাটের দশকে বেনারসের কমিউনে টানা বাহান্ন ঘণ্টায় আঁকা তাঁর ‘দি কমপিটিশন’ পেইনটিঙে তা প্রতিফলিত হয়েছে, কাজটা একটা বটগাছকে নিয়ে, যাকে তিনি উপস্হাপন করেছিলেন কেঅস এবং সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ের মেটাফর হিসাবে । এই পেইনটিঙে হাংরি আন্দোলনকারিদের উদ্দেশ্য যেমন ফুটে উঠেছে তেমনই বিটদের উদ্দেশ্য ; প্রকৃতিপৃথিবীর  সঙ্গে মানুষের একাত্মতা, যে পৃথিবীতে অশ্লীলতা বলে কিছু হয় না এবং মানুষের ইনোসেন্স পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় ।

হাংরি আন্দোলনের পরের দশকগুলোয় অনিল করঞ্জাইয়ের অঙ্কনজগতে পরিবর্তন ও পূর্নতাপ্রাপ্তি ঘটলেও, হাংরি আন্দোলনের সময়কার অভিজ্ঞতা তাঁর চেতনায় থেকে গিয়েছিল । তাঁর আইডিয়াগুলো হয়তো বিভিন্ন সূত্র থেকে আহরিত, কিন্তু হাংরি আন্দোলনের লক্ষ্য তাঁর দৃষ্টির বাইরে ককনও যায়নি । তাঁর আঁকা পরবর্তীকালের ছবিগুলো অনেকাংশে ক্লাসিকাল, বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ । তাঁর ল্যাণ্ডস্কেপগুলো দেখলে প্রথমদিকের পরাবাস্তব চিত্রকল্পের  বিরোধাভাসমূলক মনে হবে, যা তাঁর দর্শকদের বিভ্রান্ত করে । কিন্তু একথা নিশ্চয় বলা যেতে পারে যে প্ররোচনাদায়ক অলঙ্কারপূর্ণ চিত্রকল্প থেকে তিনি দূরে সরে গেলেও, ছবির ভিত্তিতে পরিবর্তন ঘটেনি । প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অনিল করঞ্জাইয়ের ছবিতে পাওয়া যাবে মানবাস্তিত্বের নাট্য যা প্রকৃতি নিজের মুড ও আঙ্গিকের মাধ্যমে প্রকাশ করে চলেছে । আর হাংরি আন্দোলনকারীদের কবিতার সঙ্গে তা খাপ খায় ।

বিনয় মজুমদার তাঁর ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতায় চিত্রকল্পর আত্মাকে ধরে রেখেছেন, যখন তিনি বলেন:

পৃথিবীর পল্লবিত ব্যাপ্ত বনস্হলী

দীর্ঘ দীর্ঘ ক্লান্ত শ্বাসে আলোড়িত করে

তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে

চিরকাল থেকে ভাবে মিলাইবে শ্বাসরোধী কথা ।

অনিল করঞ্জাইয়ের জীবনেও মিলনের এই স্বপ্ন বার বার ফিরে এসেছে তাঁর আঁকা ছবিগুলোয় । ১৯৬৯ সালে আঁকা ‘দি ড্রিমার’ নামের পেইনটিঙে অনিল স্পষ্ট করে তুলেছেন সৃষ্টিকর্মীর একাকীত্ব : সেই ‘ড্রিমার’  হাংরি আন্দোলনের সংঘর্ষময় এলএসডি মাদকে মুখিয়ে রয়েছে ; অনিলের আরেকটি ওয়াটার কালারে মলয় রায়চৌধুরীর ঘোষণা এসেছে ছবির থিম হয়ে । মলয় বলেছিলেন, “আমি মনে করি প্রথম কবি ছিলেন সেই জিনজাসথ্রপাস প্রাণী  যিনি লক্ষ লক্ষ বছর আগে মাটি থেকে একটা পাথর তুলে নিয়ে তাকে অস্ত্র করে তুলেছিলেন।” পরের দিকে অনিলের একা কবি ও দার্শনিকরা, পাথরে খোদাই করা, প্রকৃতির শৌর্যমণ্ডিত, তাদের অস্ত্র কেবল তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা । এই ছবিগুলো মহান আর্টিস্টের মতন করে আঁকা । হাংরি আন্দোলন-এ অনিলের মতন এমন একজন ছবি আঁকিয়ে ছিলেন যিনি মৌলিক ।

 

ফরজানা ওয়ারসি : হাংরি আন্দোলন – মহাসড়কে ফেরেশতার দল

D0E7196F-880F-4BE9-9F87-E38187B5FBC5

“আজ্ঞে স্যার, কালকে সকালে পাড়ার লোকেরা তাকে কুপিয়ে মেরেছে”

মলয় রায়চৌধুরী ( অস্তিত্ব )

এই কবি কোনো দলের রঙের পোশাকে র‌্যালিতে যোগ দিয়ে পথে বসে থাকবেন না, অনশনে যোগ দেবেন না, কিংবা জেল ভরে তোলার ডাক দেবেন না । ক্ষমতাবানদের থেকে অনুমোদনের ছাপ্পা তিনি পাবেন না । তিনি কোনো নিও-গান্ধি নন, তবু তাঁকে বলা হয়েছে উগ্র-গান্ধিবাদী । সে-সময়ে ‘শান্তিপূর্ণ’ শব্দটি প্রতিবাদ শব্দের সঙ্গে জুড়ে বাক্যবন্ধ তৈরি করা হয়নি । তাঁরা বৈদ্যুতিন মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেননি কিংবা বড়ো উদ্যোগপতিদের সমর্থনের জন্য হাত পাতেননি । তেমন ভাবনার কথা বললে তাঁরা চটে গিয়ে  থুতু ছিটিয়ে দিতেন ।    একেবারে সত্যকার দ্যুৎকার । পৃথিবী দেখছে ভারত কেমন জোচ্চোরদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবার দেখনদারি করছে এবং ‘নিরহঙ্কারী’ নায়ক আন্না হাজারেকে ঠেকনো দিয়ে তুলে ধরেছে, আমি সেই সময়ের কথা ভাবি যখন প্রতিবাদ ও মতান্তর ভণ্ডামির ব্যাপার ছিল না । সৎ প্রতিবাদ থেকে সৃষ্টিশীলতা জন্মায়, তাকে সাউণ্ড বাইটের জোরে বেঁচে থাকতে হয় না ।

“ আমার মনে হয় মানুষ প্রথমে তত্ব তৈরি করে আর তারপর তা প্রয়োগ করতে গিয়ে সমাজের প্রচুর ক্ষতি করেছে।    ডাণ্ডি মার্চের নকল করার ঘটনাটাই ভেবে দ্যাখো, সেকালের তত্বকে এখন প্রয়োগ করে আবার মার্চ করার প্রদর্শনী । সকলেই জানে যে ব্যাপারটা একটা ফার্স । সংস্কৃতির তত্ব হয় না ।” এই কথাগুলো আমি কুড়ি বছর আগে শুনেছিলাম । আমি বসেছিলাম হাংরি আন্দোলনের প্রধানপুরুষ মলয় রায়চৌধুরীর মুম্বাই শহরতলির ফ্ল্যাটে, সেই মানুষটির বাড়িতে যাঁর কলম থেকে ক্ষুধার্ত মানুষদের পাকস্হলির ক্ষারে পরিপূর্ণ শ্বাস বেরিয়ে আসত ।

ছোটো একটা বসার ঘরে — একটা সোফা, চেয়ার, ডাইনিং টেবিল, না ডাইনিং টেবিল ছিল না — রান্নার তেলফোড়নের আওয়াজকে  পরস্পরবিরোধী মনে হয়নি আমার । এই মানুষটি উপজাতিদের সঙ্গে জঙ্গলে বসবাস করতে যাননি, মোটা মোটা বই লেখেননি, সোয়ারোসকির মতন ঝলমলে দামি ইংরেজি বাগ্মীতায় দেশদ্রোহের বাখান দেননি । খ্রিসমাসের দিন যিশুর নামে যেমন রঙিন রাঙতা ওড়ানো হয় তেমন করে দক্ষিণপন্হীদের দিকে প্যামফ্লেট উড়িয়ে স্মিত হাসি হাসেননি । তখন অবশ্য দক্ষিণপন্হী শত্রু ছিল না । যেমন ছিল না ক্ষমতাবানদের সামনে হাত কচলানো । সব কিছুই ছিল ‘অপর’ ।

উনি নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়ে বিস্ফোরক আদর্শের খাতিরে বোমা বানাতে পারতেন। উনি নিজেকে আদর্শবাদীর মোড়কে ঢেকে ভারি মাথা আর পায়ে ফাটল নিয়ে ডিগবাজি খেয়ে মৃত্যুর দেশে চলে যেতে পারতেন। তা উনি করেননি । উনি রক্তমাংস, রক্তাক্ত জখম, মর্ত্যের নরক, পতিত এলাকার কবিতা লেখা বজায় রাখলেন। ওনার অতীতের অন্ত্রে এখনও ক্রোধ রয়ে গেছে । অতীতের হাইপোডারমিক সিরিঞ্জে মরচে ধরে গেলেও হয়তো অনেক সময়ে উইথড্রল সিম্পটম দেখা দেয়, তবু তা উনি পরিত্যাগ করেননি ।

পঞ্চাশের দশককে যখন গোর দেয়া হয়ে গেছে এবং অ্যালেন গিন্সবার্গ নিজের পোশাক পালটে একধরণের  নিশান হয়ে উঠেছেন, কলকাতার একদল কবি যাঁরা বাঙলাভাষায় কবিতা লিখতেন তাঁদের কাদামাখা হাতে আরম্ভ করেছিলেন হাংরি আন্দোলন । লিরিক রচনাকারদের অলস জীবনে তা উথালপাথাল ঘটিয়ে দিয়েছিল। হাংরি আন্দোলনকারীরা ছিলেন বিলাসবহুল খাইয়েদের প্রতিসন্দর্ভের জগতের যুবকদল, কিন্তু তাঁদের ‘হাংরি’ নামকরণ তাঁরা করেছিলেন জিওফ্রে চসারের কভাণ্টারবারি টেলসের পঙক্তি ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ থেকে এবং তার বুনিয়াদ গড়ে তুলেছিলেন অসওয়াল্ড স্পেংলারের সংস্কৃতি সম্পর্কিত ব্যাখ্যা থেকে, যে, একটি সংস্কৃতি তার অবসানের সময়ে বাইরের উপাদান আত্মসাৎ করতে থাকে । সাক্ষাৎকারে মলয় রায়চৌধুরী বলেছিলেন, যে, “আমি এই ধারণায় ক্ষুধার ও সংস্কৃতির বাস্তবতা খুঁজে পেয়েছিলাম” ।

হাংরিদের কবিতাকে বলা হচ্ছিল হিস্টিরিয়া-আক্রান্ত, কিন্তু তা সত্বেও তাঁদের কবিতা যাবতীয় টেকনিক থেকে স্বাধীন হয়ে উঠেছিল । মলয় রায়চৌধুরী তাই লিখেছিলেন, “শিল্পের জন্য সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দেবো।” সেই উক্তি কোনো ফাঁকা বাহাদুরি ছিল না । হাংরিদের কাজকর্মকে বলা হয়েছে অদ্ভুত । তাঁরা ছেঁদো পার্টিপলিটিক্স বর্জন করতে চেয়েছিলেন, যেন সবায়ের সামনে পাদতে চাইছেন, ঢেঁকুর তুলতে চাইছেন । এমনকি টাইম ম্যাগাজিন তাদের ২০ নভেম্বর ১৯৬৪ সংখ্যায় বলতে বাধ্য হয়েছিল যে, “সৃষ্টিশীলতার ঝড় বইয়ে দেবার জন্য গত গ্রীষ্মে হাংরি আন্দোলনকারীরা কলকাতার গন্যমান্য লোকেদের — পুলিশ কমিশনার থেকে ধনী চিরকুমারদের — চার অক্ষরের নিমন্ত্রনপত্রে আহ্বান জানিয়েছিলেন টপলেস প্রতিযোগীতা দেখার প্রদর্শনীতে আসতে । ব্যাপারটা হয়তো ছিল হিপোক্রিটদের আক্রমণ করার জন্য । মলয় বলেছেন যে, “রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের পরিবর্তে নিজেদের লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীরা । আমরাই প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী হিসাবে ঘোষিত হলাম এবং বাংলা কবিতার জগতে এটা ছিল প্রথম একটা ভালো খবর।”

কিন্তু তাঁর পক্ষে ভালো খবর ছিল না । রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, কম বয়সীদের নষ্ট করার প্রয়াস ইত্যাদি অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলো তাঁদের বহু সদস্যকে — এবং  মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরেকটি বাড়তি আরোপ ছিল, সাহিত্যে অশ্লীলতার । অন্যান্য সদস্যদের পুলিশ ছেড়ে দিয়েছিল, কেননা তাঁরা মলয়ের বিরুদ্ধে মুচলেকা দিয়েছিলেন । তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল যতদিন না কলকাতার উচ্চ আদালত তাঁকে মুক্তি দিয়েছে।

যে কোনো বাড়িতেই ঘটনাটা সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করবে । মলয়, তখনও বিয়ে করেননি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে এমন দৃশ্য সহ্য করতে হয়েছে যখন  তাঁর অসহায় বাবার চোখের সামনে পুলিশ তাঁর মায়ের স্টিল ট্রাঙ্ক ভেঙে ফেলেছে । তাঁর বাবা-মা স্কুলে পড়াশুনা করেননি । “হাংরি আন্দোলনে আমরা প্রায় সবাই ছিলাম প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত, দরিদ্র পরিবারের সদস্য ।” তাঁদের সামনে যা পরিবেশন করা হতো তাকেই সংস্কৃতি হিসাবে মেনে নিতে হতো । মলয়ের ঠাকুর্দা ছিলেন শিল্পী এবং রাজা-রানীদের পেইনটিঙ আঁকতেন ।

প্রতিটি বাঙালির আরেকজন ঠাকুর্দা তাঁদের প্রভাবিত করতে পারেননি । “রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কোটিপতি ; তাঁকে সামনে রেখে আমাদের প্রসঙ্গ উথ্থাপন করা যা্য় না । কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকেই নয়, পরবর্তী কবিদের থেকেও, আমাদের আত্মিক বৈশিষ্ট্য ও অনুভববেদ্যতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল । সাইত্যজগতে প্রবেশ করার সময়ে আমরা নিয়ে আসলাম আমাদের নিজেদের বর্গের অভিজ্ঞতা, যা সেই সময়ে বঙ্গসংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আলাদা ছিল । ফলে আমাদের তখনই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি ।” তাঁদের রক্তমাংসের আঘাতজনিত জখম থেকে রক্তের স্রোত বয়ে গেছে । মলয় লিখেছিলেন, “যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও।”

হাংরি আন্দোলনকারীরা কি ভীতি ছিল যে তাঁদের আরম্ভ করে যুদ্ধ তাঁরা শেষ করে যেতে পারবেন না ? সাক্ষাৎকারে মলয় বলেছেন, “এখনকার চিত্রকল্প এবং শব্দাবলী সন্ত্রাসে পরিপূর্ণ, যা এই সময়ের প্রতিফলন, যে ধরনের অভিজ্ঞতা নম্র সাধারণ মানুষ পছন্দ করে না । কিন্তু হ্যাঁ, বিশেষ পাঠকবর্গকে আকৃষ্ট করার প্রয়াস ছিল বৈকি । তারপর আমরা আত্মপ্রশ্নে জর্জরিত হতে আরম্ভ করলাম, কেনই বা পাঠককে আনন্দ দেবার জন্য লেখালিখি করা হবে ! তাকে কেন আঘাত দিয়ে জাগিয়ে তোলা হবে না ? সেক্ষেত্রে পাঠক তোমাকে মনে রাখতে বাধ্য হবে ।”

প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষও হাংরি আন্দোলনকারীদের কাজকর্মে-লেখায় ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্য আবিষ্কার করে থাকবেন — রাজনৈতিক উথ্থান — হাংরিদের লেখায় যেন তেমন ব্যাপারই ছিল । জনৈক আলোচক লিখেছিলেন যে মলয়ের প্রেমের কবিতাতেও রাজনীতি পাওয়া যায় । “ মলয় বললেন, সেভাবে দেখতে গেলে জীবনের সব ঘটনাকেই যেমনভাবে ইচ্ছা ব্যাখ্যা করা যায় । দ্যাখো, তুমি হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না, কিন্তু তোমার মনের ভেতরে কোনো কারণে যে আতঙ্ক, কিছু একটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টাকে লোকে ঈশ্বরে বিশ্বাস বলে মনে করতে পারে । বহু আলোচক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিশ্লেষণ করতে ভালোবাসেন । কিন্তু ভেবেচিন্তে কবিতায় কেউ বিশুদ্ধ রাজনীতি আনে না ।” তবু মলয় রায়চৌধুরী নিজেকে রাজনীতির মানুষ বলে মনে করেন না, হাংরি মতাদর্শের ভেতরে বসবাস করা সত্বেও । “আমরা ছিলাম সাংস্কৃতিক বহিরাগত । আমরা কলকাতাকে সেই সমস্ত জিনিস এনে দিয়েছিলাম যা তার আগে ছিল নন-মেট্রোপলিটান উপাদান”, বললেন মলয় ।

হাংরি আন্দোলন ঝালর হয়ে ঝুলে থাকার জন্য আরম্ভ করা হয়নি ; বরং তা লড়াই করে সংস্কৃতির ভেতরে প্রবেশ করে নিজের স্হানাংক নির্ণয় করতে চেয়েছিল, যে সংস্কৃতি যা পাচ্ছিল তাকেই চিবিয়ে চর্বিত চর্বণ করে ফেলছিল । অতএব কিনারে ঠেলে দেওয়া মোটেই পছন্দ হয়নি তাঁদের । হাংরি আন্দোলনকারীদের সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ডাকা হতো না । মলয় বলেছেন, “বড়ো একটা পাঠক সমাজ আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গিয়েছিল ; বন্ধুরা কেটে পড়েছিল আদালতে আমার সাজার সংবাদে । বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল আমার লেখাপত্র প্রকাশ করা । তাই লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিলাম । মাঝে আমি সাহিত্যের বিষয়ে কিছুই ভাবতাম না, নিজের ছেলে-মেয়ের সঙ্গে খেলতাম ।”

বিপ্লব তার বৃত্ত পুরো করে ফেলেছিল । যে লোকটা দেশের গ্রামেগঞ্জে চরে বেড়াতো, চাষিদের সঙ্গে সময় কাটাতো, মেঝেয় শুয়ে রাত কাটাতো, তার কাছে তখন “জীবনযাপন কবিতা লেখার চেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।” মলয়ের কাছে লেখালিখি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল । মলয় বুঝতে পারছিলেন যে গ্রামে গেলে এখন  কুয়োর জল খেলে তাঁর পেট খারাপ হয়, ফলে বোতলের জল খেতে হতো । ব্যাপারটা এমন একজন মানুষের অকপটতার প্রতিফলন যিনি একদা লিখেছিলেন, “অজস্র কাচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে” । তাহলে কোথায় পরিবর্তন ঘটল ? তাকি আনুই ? প্রতীক্ষা ? “আমি কনফিউজড । কাঠামোকে কেমন করে পালটে ফেলা যেতে পারে সে ব্যাপারে আমি কনফিউজড।” শহরতলিতে কাটানো আরামের জীবন এবং পরিবারের সঙ্গে অতিবাহিত সময় কি তাঁকে মানসিক শান্তির জগতে এনে দিয়েছিল ? কোনো রিগরেট ছিল কি ? তাঁর কোনো কোনো বন্ধু নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন । মলয় বলেছেন, “ওই ধরনের বৈপ্লবিক পন্হা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।” প্রতিষ্ঠান তো সংস্কৃতিরই অঙ্গ এবং তাও ক্রমশ অধঃপতনের পথে নেমে চলেছে । বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে বেঁচে থাকার ব্যথাগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন কিছু-কিছু ব্যাপারকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হয়, অনেককে অস্বীকার করতে হয় ।

আপনি কি বিষ খাবার পর নীলকন্ঠ ? হাংরি আন্দোলনকি এখনও প্রাসঙ্গিক ? “আমি জানি আমি বদলে গেছি”, বললেন মলয়, “আমার কবিতার ধরণও বদলে গেছে, এখন নিজেকে বিপ্লবী ঘোষণা করাটা জোচ্চুরি হবে।”

রাজপথ দিয়ে লোকেরা হেঁটে যাচ্ছে । ক্যাম্পের আগুনের চারিপাশে যুবকেরা বসে আছে । জনগণ মনে রেখেছে উড়ন্ত শব্দের কাঁপনভরা কন্ঠস্বর, মতান্তরের রেশমগুটিতে অমরত্ব পেয়ে গেছে সেই কন্ঠ । মলয় পরবর্তী কবিতায় প্রশ্ন তুলেছেন, “জামাটা গলিয়ে নেবো ? দু-মুঠো কি খেয়ে নেবো ? পিছনের ছাদ দিয়ে পালাব কি ?”

বিপ্লব এখন রোবোটের আকার নিয়েছে । সিসটেম ও কাউন্টার সিস্টেম ঘন অন্ধকারে কোন গুলো থেকেও উঁকি মেরে টেনে বের করে আনবে যাকে চায় তাকে । মলয় রায়চৌধুরী তার এখনকার কবিতায় ঠিকই বলেছেন, “দুপাশে শহর জ্বলছে/কাঁখে শিবলিঙ্গ নিয়ে ল্যাংটো মোহান্ত ছুটছে।”

আপনি নিজেই নির্নয় নিন । আজকের মিউটিনি আপনাকে খালি হাতে ফেরাবে না ।

কাউন্টারপাঞ্চ

১১ নভেম্বর ২০১১       

 

সারা হুসেন :বাংলার ষাটের দশকের বিদ্রোহী হাংরি কবিরা

36609911_1794946033918171_673102696193982464_o

           আজকের সংঘর্ষরত লেখকরা অতীতের সাহিত্যিকদের প্রতি এক রকমের চুম্বক আকর্ষণ বোধ করেন। আমরা প্রায়ই তাঁদের কাজের, জীবনযাপনের এবং জীবনশৈলীর দিকে তাকিয়ে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করি, আমাদের নিজেদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁদের উদ্যোগ এবং কার্যপ্রণালীকে গ্রহণ করার প্রয়াস করি এবং নিজের লেখক সত্তার কন্ঠস্বর খুঁজে পাই । আজকের যে সাহিত্যিক পৃষ্ঠভূমি তা যে সমস্ত আন্দোলন ও বিপ্লব থেকে গড়ে উঠেছে তার পানে তাকাই । ১৯৫০ দশকের বিট জেনারেশন যেভাবে লেখকদের আকর্ষণ করেছিল তার সমকক্ষ আর কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা দেখা যায়নি । যুবক, অগোছালো, প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখকরা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী জীবনযাপন করছেন, সমাজের নিয়মনির্দেশ অমান্য করেছেন, সেসব গালগল্প জ্যাক কেরুয়াক ও অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে শহরের পর শহর ঘুরে বেড়াবার কল্পনা করতে ভালো লাগে — সূর্যের আলো আপনার মুখের ওপর এসে পড়েছে — কেউ একজন হারমোনিকা বাজাচ্ছে — হিপি জীবনযাপনের আদর্শ, যা বিটদের সম্পর্কে রোমান্টিক ধারনা আপনার মনে তৈরি করে দিয়েছে ।

কিন্তু একবার আপনি বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে বাস্তবজীবনের কাজ-কারবারে প্রবেশ করলে, সেই ছবিগুলো ক্রমশ পালটে যেতে থাকে । যে ধরনেরই লেখক আপনি হতে চান, আপনি প্রয়াস করেন শব্দের মাধ্যমে পৃথিবীকে যতোটা বদলে দেয়া যায়, বিস্ময়কর ঐন্দ্রজালিক খেয়ালি জগতসংসার গড়া যায়, এমনকি বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটিয়ে ফেলা যায় । নিজেদের মস্তিষ্কে গড়ে তোলা  এরকম কল্পনার মানুষ আমরা সবাই হয়ে উঠতে হয়তো পারব না, ভারতবর্ষে এরকমই এক সাহিত্যিক আন্দোলন ঘটেছিল, আমাদের নিজস্ব বিট জেনারেশন, যদি তাকে বলা যায়, যা বাংলা সাহিত্যকে গ্রহণ করার, পাঠ করার ও লেখার প্রথাকে সম্পূর্ণ পালটে দিয়েছিল ১৯৬০র দশকে।

ডক্টর উত্তম দাশ তাঁর ‘হাংরি শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’ গ্রন্হে জানিয়েছেন যে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন যে চারজন তাঁদের বলা হয় ‘হাংরিয়ালিস্ট কোয়ার্টেট’, তাঁরা হলেন মলয় রায়চৌধুরী এবং তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া । আভাঁগার্দের এই ঘরছাড়ারা অচঞ্চল কলকাতার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জগতকে খুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিল ( তখন কলকাতাকে বলা হতো ক্যালকাটা ) এবং প্রকৃতপক্ষে স্বীকৃতি দেবার মতো যৌবতেজ । সদস্য সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং কবি ও লেখকেরা এই আন্দোলনে যোগ দিতে লাগলেন যার দরুন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতের জমিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে তারা উঠে এসেছিল ।

হাংরি আন্দোলনকারীরা জিওফ্রে চসারের “ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ পঙক্তি থেকে হাংরি শব্দটি নিয়েছিলেন । নয়নিমা বসুকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মলয় রায়চৌধুরী বলেছিলেন, “একটি সংস্কৃতির অবসানের পর্ব আরম্ভ হলে তা বাইরে থেকে যা পায় তাকে আত্মসাৎ করতে থাকে । আজকে পশ্চিমবাংলার দিকে তাকালে হাংরি আন্দোলনকারীদের পূর্বাশঙ্কাকে সত্য বলে মনে হয়।”

ষাটের দশক ছিল বাংলার দেশভাগোত্তর যুবসমাজের বিরক্ত প্রজন্ম । তাঁরা তাঁদের ক্রোধ এবং উৎখাত হবার বোধ যে লেখনকর্মের দ্বারা প্রকাশ করা আরম্ভ করলেন তা সেই সময়ের ঔপনিবেশিক দর্শানুপাত এবং প্রথানুগত বাংলা পঠনপাঠনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পাঠকদের ভেবে দেখতে বাধ্য করলেন যে ভারতীয় সাহিত্য কেমন দৃষ্টিতে দেখা হয় ও পাঠ করা হয় । অধ্যাপক এস. মুদগাল যেমন বলেছেন, “হাংরি আন্দোলনের মূল থিম ছিল ইতিহাস-বিশ্লেষণ সম্পর্কে অসওয়াল্ড স্পেংলারের ব্যাখ্যা, যিনি বলেছিলেন যে যখন একটি সংস্কৃতি অবসানের মুখে পড়ে যায় তখন সেই সংস্কৃতি বাইরের যাবতীয় উপাদান আত্মসাৎ করতে থাকে । হাংরি আন্দোলনের সদস্যরা মনে করেছিলেন যে বঙ্গসংস্কৃতি তেমনই এক জলবিভাজকে আক্রান্ত হয়েছে এবং বহিরাগত খাদ্যের ওপর নির্ভর করছে ।”

হাংরি জেনারেশন কেবল একদল ক্রুদ্ধ যুবকের গোষ্ঠী ছিল না । সেই সময়ে বাংলা সাহিত্য, উচিত শব্দাবলীর অভাবে বলা যায়, সীমিত হয়ে গিয়েছিল এবং অত্যন্ত কম সংখ্যক পাঠকের জন্য রচিত হতো। হাংরি আন্দোলনকারীরা এর থেকে বেশি কিছু চাইছিলেন — তাঁরা এক নতুন ভাষা চাইছিলেন, এক নতুন সাহিত্য পরিসর যা সাধারণ বাঙালিদের  প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারে, কেবলমাত্র কয়েকজন এলিটের বোধগম্যতায় সীমিত না থাকে । যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ঈপ্সিতা চন্দ বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “হাংরি আন্দোলনকারীদের অবস্হান ছিল চরম আইকনোক্লাসটিক ; তখনও পর্যন্ত যা কিছু অলঙ্ঘনীয় ছিল তাকে ভেঙে ফেলার জন্য , এমনকি যেভাবে কবিতা লেখা হতো, তাও, এবং যেভাবে তাঁরা জীবনযাপন করতেন, তাতে প্রতিফলিত হতো । অধ্যাপক চন্দ বলেছেন, তাঁদের হতাশা কেবল কবিদের মধ্যেই সীমিত ছিল না, একটি সমগ্র উচ্চশিক্ষিত যুবকবর্গ অনুভব করত যা তাদের কোনো ভবিষ্যত নেই ।”

চারজন হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিলেন আরও অনেক খ্যাতনামা কবি-লেখক, যেমন সুবিমল বসাক, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ত্রিদিব মিত্র, সুভাষ ঘোষ, ফালগুনী রায়, অরুণেশ ঘোষ এবং আরও অনেকে । এই সমস্ত লেখকরা এসেছিলেন দরিদ্র পরিবার থেকে, এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আবহ তাঁদের কন্ঠস্বরকে আরও উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল ।

স্হানীয় ভূখণ্ডের ইতিহাসে সেই সময়টি ছিল ভীষণ কঢিন । দেশভাগের ফলে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, কোথাও মাথা গোঁজার মতো কপর্দক ছিল না তাঁদের — নিজের বলার মতো জায়গা ছিল না । দারিদ্র্য ছিল চরম, খাদ্যের ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের অভাব, অথচ তা তখনকার সাহিত্য ও ভাষায় প্রতিফলিত হচ্ছিল না — প্রবেশ করতে পারছিল না এলিটদের বৈঠকখানায়, যাঁরা নিজেরা বেশ আরামের জীবন যাপন করছিলেন । হাংরি আন্দোলনকারীরা এই বাস্তব অবস্হার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন, এবং সেই সমস্ত ঘটনা ও গল্প তুলে ধরছিলেন তাঁদের প্রকাশিত বুলেটিন ও প্যামফ্লেটে ।

হাংরি আন্দোলন সমস্ত রকমের চলিত রীতি ও ভাষাকে ভেঙে ফেলতে লাগলেন — তা প্রথানুগ আঙ্গিকের, বিষয়বস্তুর, ছন্দের দিক থেকে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তখনকার ‘এলিট’ সাহিত্য যা বাজার দখল করে রেখেছিল তা থেকে একেবারে পৃথক । ‘এলিট’ সাহিত্য রচিত হত নম্র, সংস্কৃতিবান, সভ্য, শোভন ভাষায়, এবং তার ভেতরে হাংরি আন্দোলন বিশুদ্ধ নৈরাজ্য নিয়ে প্রবেশ করল । রবীন্দ্রনাথের ভাষাকে তাদের মনে হয়েছিল ভেজিটারিয়ান, যখন কিনা তাঁদের নিজেদের ভাষা ছিল পথচলতি মানুষের এবং আটপৌরে কথাবার্তার, জনগণের জন্য গড়া ভাষা, সদ্যপ্রসূত আবং যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় — “জীবনের ভাষা”, যাকে অন্যেরা অশোভন ও অশ্লীল বলে দেগে দিচ্ছিলেন ।

নয়নিমা বসুকে দেয়া সাক্ষাৎকার মলয় রায়চৌধুরী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তাঁরা ঔপনিবেশিক সাহিত্যিক মানদণ্ডকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের একাত্ম করেছেন উত্তরঔপনিবেশিক সময়-পরিসরের সঙ্গে। তাঁরা নিজেদের লেখাপত্র প্রকাশ করতেন এক পাতার লিফলেটে এবং সেগুলো বিলি করতেন কফিহাউসে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদপত্র দপতরে । তাঁদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী কার্যকলাপ অ্যালেন গিন্সবার্গকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল, যিনি ষাটের দশকে ভারতে বসবাসের সময়ে মলয় ও সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন । কিন্তু প্রভাবশালী বঙ্গসমাজ তাঁদের সেভাবে গ্রহণ করতে পেরেনি । সমাজের সমালোচনার অর্থ রাজনীতির ও ক্ষমতানশীনদের আক্রমণ । নয়নিমা বসু লিখেছেন, হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ক্রোধ শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল যখন হাংরি কবিরা ক্ষমতাবানদের, বাঙালি রাজনীতিকদের, আমলাদের, সংবাদপত্রের সম্পাদকদের জোকার, রাক্ষস, দেবী-দেবতা, জীবজন্তু ও কার্টুন চরিত্রের কাগজের মুখোশ পাঠালেন । মুখোশের ওপর লেখা ছিল “দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন।”

এগারোজন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হল, এবং মলয় রায়চৌধুরীকে, যাঁকে মনে করা হতো হাংরি আন্দোলনের মুখপত্র ও নেতা, তাঁকে সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার করা হল । তাঁর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ( ইংরেজিতে Stark Electric Jesus রূপে অনুদিত ) সভ্য বাঙালি ভদ্রলোকেদের রুচিবিরোধী মনে হল, এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও কবিতায় অশ্লীলতার অভিযো্গ আনা হল । তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পঁয়ত্রিশ মাস চলেছিল, তাঁকে হাজতে পোরা হয়েছিল, এবং দুই মাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিল । বহু সদস্য এই সময়ে হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করে চলে গেলেন, কয়েকজন চাকরি হারালেন, কেউ কেউ জীবনের অন্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন । মলয় রায়চৌধুরী কিন্তু নিজের পরিবার ও অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে সমর্থন পেলেন, এমনকি টাইম ম্যাগাজিনে তাঁর মামলার খবর পেয়ে ওক্তাভিও পাজ ও আরনেস্তো কার্দেনাল তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন । তাঁর সমর্থনে অ্যালেন গিন্সবার্গ এই  চিঠি লিখেছিলেন ভারতীয় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামের যুগ্মসম্পাদক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে :-

 

৭০৪ ইস্ট ফিফ্থ স্ট্রিট, নিউ ইয়র্ক, অ্যাপট ৫ এ

প্রিয় আবু সয়ীদ

জঘন্য ! আপনার বাগাড়ম্বর আমায় বিভ্রান্ত করে তুলেছে, মাথা গরম করে দিচ্ছে আমার । আপনি প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, “আমার কোনও পদমর্যাদা নেই”, এসব কথার মানে কী ? ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের উদ্যোগে চলা চতুর্মাসিক পত্রিকার সম্পাদক আপনি । আপনার নিজস্ব লেটারহেড রয়েছে । কমিটির ভারতীয় এক্জিকিউটিভদের তালিকা আপনার হাতের কাছেই আছে, ভারতে কমিটির ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কেও আপনি ওয়াকিবহাল । চিনের ভারত আক্রমণের সময়ে আমি কলকাতায় একটি বড়সড় সমাবেশে উপস্হিত ছিলাম, যেখানে আপনার সহসম্পাদক শ্রীঅম্লান দত্ত সাংস্কৃতিক বর্বরতা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছিলেন । যা হোক, শ্রীবি ভি কার্নিককে আমি চিঠি লিখেছিলাম. যদিও আমার মনে হচ্ছিল যে, কলকাতা কমিটির কোনও সদস্য বা কমিটির সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিরই কাজটি করা দরকার ছিল । আর বাগাড়ম্বর বলতে আমি বোঝাতে চাইছি “আপত্তিকর উপাদান”-এর কথা । মশায়, আপনি ও পুলিশই একমাত্র সেগুলিকে আপত্তিকর বলছেন । সেগুলি নিছক আপত্তিকর তকমা পাওয়া উপাদান মাত্র, প্রকৃত আপত্তিকর নয় । পরের দিকে যে বলেছেন, “প্রশ্নাতীত আপত্তিকর”, তা-ও নয় । আমি আপনাদের আপত্তি তোলা নিয়েই প্রশ্ন করছি, তাই তা এতোটুকুও “প্রশ্নাতীত” নয় । আসলে পুরোটাই হল রুচি, মতামত ইত্যাদির ব্যাপার । পুলিশ তাদের নিজেদের ও অন্যদের রক্ষণশীল সাহিত্যরুচি চাপিয়ে দিচ্ছে জোর করে । আমার মতে এটি কালচারাল ফ্রিডাম বা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতারই বিষয় । আশা করছি, এ-বিষয়ে ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম, বিশেষ করে সেটির কলকাতা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা-ও একমত হবেন । আমার আরও অদ্ভুত লাগে জেনে যে, এক্ষেত্রে কারওকে সাহায্য করা মানে নবীন লেখকদের বলা, তাদের মতাদর্শ থেকে পিছু হটতে, নিজেদের অবস্হান পালটাতে, ইত্যাদি । ব্রডস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো প্রমুখের ক্ষেত্রে যেরকম করা হয়েছিল সেরকমই একেবারে । এমনকী তাঁরা যে “ফালতু” লেখক, সেটাও । আমি আপনাকে ফের রাগাতে চাই না । আপনি ক্ষুব্ধ হন যাতেভ তেমন কিছু বলছি না । কিন্তু একটি কথা বলতেই হবে যে, বর্তমান ইশ্যু নিয়ে আমার-আপনার পত্রালাপ আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছে ওই নবীন রুশ কবিরা কেন আপত্তিকর বা ফালতু, সেই নিয়ে রুশ আমলাদের সঙ্গে আমার কথোপকথন । “দায়িত্বহীন, নিম্ন মানের লেখা, নিম্ন রুচি।” ব্রডস্কির মামলার সময়ে, আপনার মনে থাকতে পারে, বিচারক প্রায় সারাক্ষণ ব্রডস্কিকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, “কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক কবে আপনার মর্ম স্বীকার করেছে।” বেচারা মলয়, — যদি ও একজন নিম্ন মানের লেখকও হয় — তা হলেও ওর জায়গায় আমি থাকলে আপনার সন্মুখীন হতে আমি ঘৃণা বোধ করতাম ।

ওরা সকলেই সম্পূর্ণ বুদ্ধিহীন, জ্যোতির্ময় দত্ত যদি একথায় আপনার সহমত হয়, তাহলে ও আপনার আত্মগরিমা তুষ্ট করার জন্য সাধুতার ভান করেছে । দলের সবাই, ছাব্বিশজন যাদের জেরা করা হয়, সুনীল, উৎপল বসু, সন্দীপন, তারাপদ তো আছেই, এরা ছাড়াও অন্য যারা গ্রেপ্তার হয় সেই সব মধ্যমানের লেখকরা — যদিও মলয়ের নির্যাতনের প্রতি প্রতিষ্ঠানের ক্রুদ্ধ মনোভাব দেখে মলয়ের নির্বুদ্ধিতার প্রতি আমার মমত্ব জাগছে — এরা সবাই ফালতু এমন দাবি করা আপনার পক্ষে বা জ্যোতির পক্ষে অসম্ভব। কৃত্তিবাস-হাংরি গোষ্ঠীকে — এই মামলায় যারা সকলেই পুলিশের দ্বারা হেনস্হা হয়েছে — সমর্থন করেন এমন কোনো বাঙালি লেখক বা সমালোচককে যদি আপনি না চেনেন, তাহলে আপনার মতামত সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে । নিজেকে একদম আলাদা রেখে বুদ্ধদেব বসু তাদের গুণের স্বীকৃতি দিয়েছেন, যেমন দিয়েছেন বিষ্ণু দে ও সমর সেন । আমি শুধু মলয় নয়, গোটা দলটার কথা বলছি ।

এর পাশাপাশাই আপনার আরও একটা স্টেটমেন্ট আমায় অবাক করেছে। আপনি বলছেন, পাশ্চাত্য দমননীতির বিরুদ্ধেও কংগ্রেসকে একইরকম ভূমিকা নিতে হবে, “আমি পর্তুগাল, স্পেন ও পাকিস্তানের কথা বলছিলাম”। এখনও পর্যন্ত আমার শোনা আপনার বক্তব্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তিকর ( আমার কাছে ) এটি । লরেন্স, ফ্যানি হিল, জেনে, বারোজ, মিলার, আপনাদের কামসূত্র, কোনারকের আলোকচিত্র — এসব ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে, বহুল প্রচারিত আইনি মামলা চলেছে, শায়েস্তা করার চেষ্টা চলেছে । এছাড়াও ফ্রান্সে একাধিক সংবাদপত্র ও আলজেরিয় যুদ্ধ বিষয়ক বই দমননীতির কোপে পড়েছে, পড়ছে । রাজনৈতিক কারণেই এই দমন । এমনকী কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামও এর কয়েকটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যদিও তা নিতান্ত অনিচ্ছুকভাবেই । কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম সম্ভবত আয়রন কার্টেন দমননীতির বিরুদ্ধেই সরব হতে পছন্দ করে, পাশ্চাত্য দমননীতির বিরুদ্ধে নয় — আমার এ ধারণা আরও বেশি করে দৃঢ় হচ্ছে, বিশেষ করে আপনার প্রতিক্রিয়ার ধরন-ধারন দেখে । এই বিগত এক বছরেই নিউ ইয়র্ক শহরে চলচ্চিত্র, বই সংক্রান্ত পুলিশি ধরপাকড় তো হয়েইছে, এমনকী কমেডিয়ানরাও ( লেনি ব্রুস-এর ঘটনা ) বাদ যাননি । আমার মনে হয়, আপনার এ সম্পর্কে যতোটা জানা প্রয়োজন ততোটা আপনি জানেন না । ভদ্র ভাষায় বলতে তাই দাঁড়ায় আর কী । যেমন, আপনি কি জানেন যে, ইংরেজি ভাষায় যে প্রকাশক ডুরেল, মিলার, বারোজ, জেনে, নবোকভ, টেরি সাদার্ন, দ্য সাদে ও প্রাচ্য প্রণয়গাথা প্রকাশ করেছিল, সেই অলিম্পিয়া প্রেস ফরাসি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ? এ ব্যাপারে ফরাসি কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম কিছু করতে তেমন উৎসাহী ছিল তা নয় । অলিম্পয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া এক আন্তর্জাতিক কেচ্ছায় পরিণত হওয়ায় একটু নড়েচড়ে বসে তারা এখন একটা পিটিশন দিয়েছে । নিশ্চয়ই এটা জানেন যে, ভারতে লেডি চ্যাটার্লিজ নিষিদ্ধ ? ভারতীয় কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম কি এ বিষয়ে মাথা ঘামিয়েছে ? হাংরি আন্দোলনকারীরা তো হাল আমলের ।

যা হোক, এসবই তত্ত্বকথা, আমার ক্ষোভ উগরে দেয়া — মতের বিনিময় — ঈশ্বরের দোহাই, মাথা গরম করবেন না — মলয় রায়চৌধুরী ও তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে আনা পুলিশের অভিযোগ মনে হয় এখনও রুজুই আছে — মলয় লিখেছে যে এই ২৮ ডিসেম্বরই বিচার শুরু হবে — এই অদ্ভুত পরিস্হিতি থেকে মুক্ত হবার মতো প্রবীণ লেখকদের কাছ থেকে কোনো সহায়তাই পাওয়া যায়নি এখনও পর্যন্ত — ও বলেছে, বোধহয় ওর কথাগুলো সত্যিই, যে “আমাদের গ্রেপ্তার হওয়ার ফলে কবি ও লেখকরা এতোটাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে এখানে যে, তারা প্রায় সকলেই তাদের লেখার ধরণটাই পালটে ফেলেছে।” অবশ্যই যে লেখক দলকে ও চেনে, তাদের কথাই বলছে, “প্রতিষ্ঠিত” বয়স্কদের কথা নয় । ও লিখেছে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পায়নি ও । আপনিও এড়িয়ে গেছেন । আর “আমাদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমাদের কোনো বুলেটিন বা ম্যাগাজিন আমরা ছাপাতেই পারছি না।”পুলিশের ভীতি । উৎপল বসু আজ একটি চিঠিতে লিখেছে, “ভীষণ বাজে খবর। আজ আমার কলেজ কর্তৃপক্ষ ( যেখানে আমি জিওলজি পড়াই ) আমায় পদত্যাগ করতে বলল । আমার কোনো যুক্তিই ওরা শুনতে নারাজ । আমার তো একরকম সর্বনাশ হয়ে গেল । ওরা “টাইম” পত্রিকা খুলে দেখিয়ে বলল : এই তো আপনার ছবি ও বক্তব্য । আপনার মতো কোনো লোক আমাদের এখানে থাকুন, এ আমরা চাই না । আমার চিঠিপত্র পুলিশ ইনটারসেপ্ট করছে । আপনি আমার শেষ চিঠিটি পেয়েছেন, ইত্যাদি।” এ একদম অসুস্হকর এক পরিস্হিতি । এরকমভাবেই সব চলতে থাকবে, এই ভেবে চিন্তিত হয়ে আমি আসলে প্রাথমিকভাবে আপনাকে তড়িঘড়ি, অতি দ্রুত চিঠি লিখেছিলাম । কারণ পুলিশি শাসনতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমার ভারতে থাকতেই হয়েছে । এখন কিন্তু পরিস্হিতি যথেষ্ট সংকটপূর্ণ । প্রবীণ দায়িত্ববান কোনো সদাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হস্তক্ষেপ না করলে এর থেকে নিষ্পত্তি সম্ভব নয় । বোধহয় ক্যালকাটা কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর প্রতি চিঠি আপনাকে উদ্দেশ করে লেখা আমার উচিত হচ্ছে না । যদি তাই হয়, তাহলে কলকাতা কংগ্রেসের দপ্তরে এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্তের হাতে দয়া করে চিঠিটি পৌঁছে দেবেন । আপনাকে রুষ্ট করে থাকলে মার্জনা করবেন । তবে চিঠিতে অন্তত আপনাকে সোজাসুজি কথাগুলো বলছি । এই মুহূর্তে আপনার-আমার মতানৈক্যের থেকেও পুলিশ পরিস্হিতিই প্রকৃত চিন্তার বিষয় ।

অনুগত — অ্যালেন গিন্সবার্গ

পুনশ্চ : আমার বিলম্বিত উত্তরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী । পিটার অরলভস্কি ও আমি গত এক মাস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাদানে ব্যস্ত ছিলাম । আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই কেমব্রিজ থেকে ফিরেছি ।

 

কলকাতা উচ্চ আদালতে মলয় রায়চৌধুরী জিতে যান, কিন্তু ততদিনে হাংরি আন্দোলনকারীদের সংখ্যা মাত্র কয়েকজন । মলয় রায়চৌধুরী বলেছেন যে ইতিমধ্যে বিদেশিরা তাঁর কবিতা ইউরোপ আমেরিকায় ্রৌঁছে দিয়েছিলেন এবং তাঁর রচনা সেখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোয় অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছিল ।” মামলার খরচের চাঁদা তোলার জন্য আমার কবিতা নিউ ইয়র্কের সেইন্ট মার্কস চার্চে পঠিত হয়েছিল, নয়তো আমার যা আর্থিক অবস্হা ছিল, উচ্চ আদালতে মামলার খরচ যোগানো অসম্ভব হতো ; বন্ধুরা যারা হাংরি আন্দোলনে ছিল রাজসাক্ষী হয়ে আমাকে ছেড়ে পালিয়েছিল, চাকরি থেকে নিলম্বিত হয়ে গিয়েছিলুম, গ্রেপ্তারির সংবাদ সহ্য করতে না পেরে ঠাকুমা মারা গেলেন , লেখালিখিও  আমাকে ছেড়ে চলে গেল ।”

কিন্তু হাংরি আন্দোলনের সন্মোহন ও উদ্দীপনা এখনও তরুণ কবি-লেখকদের মধ্যে জাগ্রত এবং মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্য হাংরিদের রচনাবলী, তাঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও, আন্দোলন জীবন্ত থেকে গেছে। হাংরি আন্দোলনকারীরা কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, সারা ভারতের বিভিন্ন ভাষায় যে ছাপ ছেড়ে গেছেন তা মুছে ফেলা যাবে না । হাংরি আন্দোলনকারীদের মনে করা হয় সাহিত্যজগতের নায়ক, তা সে ধারনা যতোই রোমান্টিক হোক না কেন । এই সেই লেখক-কবির দল যারা নতুন কন্ঠস্বরের জন্য ছিল ক্ষুধার্ত এবং নিজেদের আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছিল, তাদের সাহসী ও বেপরোয়া লেখার মাধ্যমে ঝড় তুলতে পেরেছিল রাজনৈতিক এলাকায়, তাঁদের আরম্ভ করা সেই ঝড় যেন ছিল ঘোষণা, আসন্ন পরিবর্তনের ঘোষণা ।

 

ঋণস্বীকার : হোমগ্রোন.কম.ইন

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে প্রকাশিত

নয়নিমা বসু : হাংরি আন্দোলন ও পচনরত কালখণ্ড

    35329381_2182672185304648_5394644142577942528_n

         পশ্চিমবাংলার দেশভাগোত্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন কালখণ্ড    এক নতুন প্রতিবাদী সাহিত্যের জন্ম দিয়েছিল । মলয় রায়চৌধুরী যিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টাদের অন্যতম তিনি পঞ্চাশ বছর পর আমার সঙ্গে এই আন্দোলনের জীবন সম্পর্কে আলোচনা করলেন ।

         “একটি সংস্কৃতির অবসানের সময়ে সেই সমাজের মানুষ যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে”, মুম্বাইয়ের কাণ্ডিভালির একঘরের ফ্ল্যাটে বসে চিন্তারত মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “আজকে যখন পশ্চিমবাংলার দিকে পেছন ফিরে তাকাই তখন হাংরি আন্দোলনের পূর্বাশঙ্কাকে ভবিষ্যবাণীর মতন মনে হয়।”

         মলয় রায়চৌধুরী, এখন ৭২ বছর বয়স, যিনি প্রথম থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী সাহিত্যিক, নভেম্বর ১৯৬১ সালে আভাঁগার্দ সাহিত্য আন্দোলন হাংরি জেনারেশন আরম্ভ করেছিলেন । সেই আন্দোলন সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং ভদ্রলোক বঙ্গ সমাজের কটু সমালোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল । হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যের প্রথাবাহিত মৌল তর্কবিন্দুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল ।

       সেই সময়ে কলকাতা, যাকে তখন বলা হতো ক্যালকাটা, অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। দেশভাগের সর্বনাশা কারণে উৎখাত মানুষদের ভয়াবহ স্রোত বদলে দিচ্ছিল কলকাতা শহর ও তার আশেপাশের শহরতলি অঞ্চলকে । দেশভাগের আগে থেকেই আতঙ্কিত মানুষেরা পশ্চিমবাংলায় আসা আরম্ভ করেছিল এবং তা ষাটের দশকে এবং তার পরেও বহুকাল বজায় ছিল । ১৯৫৯ পর্যন্ত বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে গিয়েছিল, এমনকি ভিটে ছাড়ার সময়ে খুন হয়েছিল ।    যুবসমাজের একটা অংশ এই সর্বনাশকে সহ্য করতে অপারগ ছিল । তাদের মনে হয়েছিল যে ভারতের কংগ্রেস পার্টির নেতারা  স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তা পরিণত হয়েছে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে । নিজেদের ক্রোধকে প্রকাশ করার জন্য কয়েকজন তরুণ আরম্ভ করলেন হাংরিয়ালিস্ট  আন্দোলন, যা হাংরি জেনারেশন নামে খ্যাত ।

       সাক্ষাৎকারে মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “১৯৫৯-৬০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পৌঁছে গিয়েছিল পচনের টকে যাওয়া কালখণ্ডে ; আমার বয়সী যুবকেরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিল। এই সময়ে সমাজের প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছিল বুদ্ধিজীবীদের, যে ক্ষমতাবিন্যাস ততদিনে দখল করে নিয়েছিল রাজনীতিকদের দল, যারা বেশির ভাগই ছিল কানা গলির ব্যক্তিএকক । পশ্চিমবাংলাকে ছেয়ে ফেলেছিল পার্টিশানের ঝোড়ো তরঙ্গ । আমার মানসিক অবস্হা কবিতা লেখার পরিবর্তে এই পচনের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল । ফলে আমরা পরামর্শ করে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করতে বাধ্য হলুম ।”

         মলয় রায়চৌধুরী এই আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরী এবং আরও দু’জন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়ের সঙ্গে । তিনি ‘হাংরি’ ধারনা পেয়েছিলেন মধ্যযুগের ইংরাজ কবি জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ পঙক্তি থেকে । এই চারজন বাঙালি কবি মিলে হাংরি বুলেটিন ও ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করতে লাগলেন আর তা বিলি করা আরম্ভ করলেন কলকাতার বিখ্যাত কফিহাউসে, সরকারি অফিসে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদপত্র দপতরে ।

         রায়চৌধুরী ভাতৃদ্বয় দ্বারা আরম্ভ-করা এই আন্দোলনের কোনো দপতর, হাইকমাণ্ড বা পলিটব্যুরো ধরণের কেন্দ্র ছিল না এবং এর সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে কোনো রচনা লিখে নিজেরা প্রকাশ করতে পারতেন । মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “হাংরি আন্দোলনের আগে আর কোনো এরকম সামাজিক-রাজনৈতিক সাহিত্য আন্দোলন হয়নি। তাছাড়া আমরা আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলুম। বহু যুবক লেখক ও চিত্রশিল্পী আন্দোলনে যোগ দেয়া আরম্ভ করলেন । সরকার যখন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ আরম্ভ করল, ততদিনে তিরিশ জনের বেশি সদস্য হয়ে গিয়েছিল।”

        মলয় রায়চৌধুরী     পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছিলেন । বাংলা সাহিত্যে তাঁর আগ্রহ তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরীর কারণে, যিনি কলেজে পড়ার জন্য পাটনা থেকে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন এবং আদি নিবাস উত্তরপাড়ায় সেসময়ে থাকতেন ।

        প্রশাসনের দৃষ্টি হাংরি আন্দোলনকারীরা সেই সময়ে আকর্ষণ করলেন যখন তাঁরা ক্ষমতাধিকারীদের, বাঙালি রাজনৈতিক নেতাদের, আমলাদের এবং সংবাদপত্রের মালিকদের জোকার,  দানব, দেবী-দেবতা, রাক্ষস, কার্টুন ইত্যাদির কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে জানালেন “দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন।”

        ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ এগারোজন হাংরি কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো । তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং সাহিত্যে অশ্লীলতা । মূল অভিযোগ ছিল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে তাঁর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় অশ্লীলতার জন্য, ইংরেজিতে ‘স্টার্ক ইলেকট্রিক জেশাস’ নামে অনুদিত ।

         আদালতে মামলা বেশ কয়েক বছর যাবত চলল । তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার সংবাদ ৪ নভেম্বর ১৯৬৪ টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হল এবং তার ফলে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করল । ওক্তাভিও পাজ, আর্নেস্টো কার্ডেনাল প্রমুখের মতন কবি মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলেন । বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গও মলয় রায়চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েছিলেন । এর ফলে ভুল ধারনা প্রচারিত হয়েছিল যে হাংরি আন্দোলনকারীরা বিট আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত ।

        মলয় রায়চৌধুরী তাঁর সাক্ষাৎকারে জানালেন, “প্রচারের দরুন আমার কবিতা ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে সেখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোয় প্রকাশিত হওয়া আরম্ভ হলো । নিউ ইয়র্কের সেইন্ট মার্কস চার্চে আমার কবিতার পাঠ-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হয়েছিল মামলার খরচ তোলার জন্য । এই সাহায্যগুলো ছাড়া হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা লড়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না । আমার আর্থিক অবস্হা ভালো ছিল না । বেশিরভাগ হাংরি বন্ধু আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন । আমি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হলুম, আমার জেলহাজতের সংবাদে আমার ঠাকুমা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন । আমি সাময়িকভাবে লেখালিখি ছেড়ে দিলুম।”

         মলয় রায়চৌধুরী আরও বললেন যে, পরবর্তী নকশাল আন্দোলনের কারণে হাংরি আন্দোলন এক প্রকার আড়ালে চলে গিয়েছিল, যদিও নকশালরা সেরকমভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখালিখি করেননি ।

         শেষ পর্যন্ত সাহিত্যিকদের সহযোগীতায় এবং পরিবারের সমর্থনে মলয় রায়চৌধুরী মামলায় জিতে যান। কিন্তু ততদিনে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল । বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং হিন্দি ভাষায় ( ভুখি পীঢ়ী এবং হাংরি জেনারেশন হিসাবে খ্যাত ) এই আন্দোলন সম্পর্কে বৃহত্তর জনগণ বিশেষ জানেন না এবং বিষয়টি বুঝতে পারেন না ।

মলয় রায়চৌধুরী বললেন যে, “আমি মনে করিনা হাংরি আন্দোলন বিফল হয়েছিল ; সরকার এই আন্দোলনকে দাবিয়ে দিয়েছিল । এই আন্দোলন আরও বহু ভারতীয় ভাষায় ছড়িয়ে পড়ছিল এবং সেই সময়ে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে বাধার সৃষ্টি করেছিল । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে নেতার পদ দেয়া হয়েছিল, তিনি ১৯৬৩ সালে আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন আর আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন । কয়েকজন, যাঁরা উদবাস্তু পরিবার থেকে এসেছিলেন, ভয়ে আন্দোলন ছেড়ে চলে গেলেন, কেনা তাঁরা জানতে পেরে গিয়েছিলেন যে সরকার আন্দোলনের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে চলেছে । কয়েকজনকে সিপিএম এবং অন্যান্য বামপন্হী দল লোভ দেখিয়ে ভাঙিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল ( যেমন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ প্রমুখ )।”

১৯৬৮ সালে মলয় রায়চৌধুরী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন, যিনি রাজ্য স্তরের ফিল্ড হকি খেলোয়াড় ছিলেন । আদালতে মামলা জিতে যাবার পর মলয় লখনউতে এআরডিসিতে যোগ দেন । মলয় এ-পর্যন্ত সত্তরটির বেশি বই লিখেছেন, সবই ছোটো প্রকাশকদের দ্বারা প্রকাশিত – প্রচুর পাঠক থাকা সত্ত্বেও বড়ো প্রকাশকরা আগ্রহ দেখান না । দুই বার হার্ট অ্যাটাকের পর এবং অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি  ও আরথ্রাইটিসের কারণে মলয় কলম ধরে লিখতে পারেন না, কমপিউটারে টাইপ করে লেখেন ।

মলয় রায়চৌধুরী বললেন, “তরুণরা প্রায়ই আমাকে অনুরোধ করেন আবার হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করার জন্য । আমি তাঁদের বলি নিজেদের সময় ও পরিসরকে নিজেরা বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নিতে এবং নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম গড়ে নিতে ।”

 

 

 

 

 

                                                                                                                                                                       

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ঋণস্বীকার : বিজনেস স্ট্যাণ্ডার্ড

২১ জানুয়ারি, ২০১৩

 

 

 

মধুবন্তী চন্দ : “আমিই ক্ষুধা – তোমাদের জিভের মতান্তর” — হাংরি আন্দোলনকারীদের কাব্যবিপ্লব

46764749_1959274150797063_7616396124542205952_o(1)

গত শতকের অবক্ষয় এবং অধঃপতনকে আর. কে. লক্ষণ-এর মারাত্মক কলমে সৃষ্ট ‘কমন ম্যান’-এর মতন আর কোনো কিছুই ভালো ভাবে তুলে ধরতে পারেনি ।  নোংরামিতে ভুগতে থাকা একটি প্রজন্মের অন্তরজগতের সত্তাকে তাঁর ক্যারিকেচারগুলো, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষয়ে পচে যাওয়া অবস্হাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট করে তুলেছিল । সামাজিক অস্হিরতায় তা পাওয়া গেছে, বলিউড ফিল্মে তা দেখা গেছে । সত্যিই, যদি ভেবে দেখা যায়, ষাটের, সত্তরের আর আশির দশকের, মুখ বন্ধ করে দেয়া স্মৃতির তলদেশ থেকে উঁকি দিতে দেখা যায় দাঁতে দাঁত চেপা উথালপাথাল, ভুল পথে চলে যাওয়া রাজনৈতিক ধারণা, ভেঙে-পড়া অর্থব্যবস্হা এবং ক্ষুধার্ত জোয়ারের  উত্তাল ।

এই বিধ্বস্ত সময়েই জন্মেছিলেন হাংরি আন্দোলনের আভাঁগার্দ কবির দল, পশ্চিমবাংলাকে কেন্দ্র করে, তারপর ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, এমনকি ইটালি, ফ্রান্স এবং জার্মানি ইত্যাদি দেশে । যদিও তাদের আভাঁগার্দ তকমা দেয়া হয়েছে, তাঁদের রচনাবলী পড়ে আমার মনে হয়েছে তাঁরা নিরীক্ষারত বিতর্কিত কবিদের চেয়েও অনেক বেশি কিছু । তাঁরা ছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, ভূমি থেকে উৎপাটিত, জখমে আঘাতপ্রাপ্ত, শহরের পথে ছোটানো রাগি টাঙাওয়ালার মতন, কম পয়সায় কাজ করিয়ে নেয়া শ্রমিকের মতন, যারা শহরের ঘিঞ্জি বস্তিতে গালমন্দ করে জীবন কাটায়, উদ্বাস্তু শিবিরে কোনঠাশা শ্বাসরুদ্ধ দেশত্যাগী মানুষেরা, বঞ্চিত মানুষের যে ছবি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, সবই । হিন্দিতে নামকরণ করা হয়েছিল ‘ভুখি পিঢ়ি, বাংলায় ‘ক্ষুধিত প্রজন্ম’, যে নামে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ।

তাঁর বিখ্যাত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায়, যে কবিতার জন্য তাঁকে জেলে পোরা হয়েছিল, হাংরি আন্দোলনের কবি মলয় রায়চৌধুরী লিখেছিলেন :

 

“সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাবো

শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দেবো

কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই”

 

হাংরি আন্দোলনকারীদের কার্যসূচি ছিল সুস্পষ্ট : তাঁরা ছিলেন ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ । যা কিছুই আইন, রাজ্য, রাষ্ট্র, সমঝোতা, সীমাবদ্ধতার শৃঙ্খলায় বেঁধে-ফেলা, আনুগত্যের দাবিদার, মধ্যবিত্ত, মূল্যবোধকাঠামো, বুর্জোয়াপনার সামান্যতম রেশ যাতে ছিল, তাকে উল্টে দিয়েছিলেন তাঁরা । কিন্তু তাঁরা মার্কসবাদের আইডিওলগ হবার ভান করেননি, বরং ছিলেন  মার্কসবাদবিরোধী । মজার ব্যাপার হল, সেই সময়েই মার্কসবাদীরা ছিলেন শাসন-ক্ষমতার অধিকারী আর রাজ্যের প্রশাসক, যাকে তাঁরা বিধ্বস্ত করতে চাইছিলেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের ইশতাহারগুলোয় ছিল ঝোড়ো লক্ষ্য, যা থেকে বুঝতে পারা যায় যে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে প্রতিবাদী এবং আটপৌরে মানুষের সংস্কৃতির বাইরে যার দরুন তাঁদের কবিতাগুলো সরাসরি অশ্লীলতার পর্যায়ে গিয়ে পড়েছে, কলার-তোলা এলিট সম্প্রদায়কে আক্রমণ করেছে যে এলিটরা তখনও পর্যন্ত উনিশ শতকের মাইকেল মধুসূদনের আলোয় নিজেদের আলোকিত করছেন, এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যোতিতে।

তাঁরা ঢাকার কুট্টি-টাঙাওয়ালার বুলিতে লিখেছেন ( সুবিমল বসাক-এর ছাতামাথা উপন্যাস ) এবং মৃত ভ্রুণ ও সঙ্গমের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়েছেন ( শৈলেশ্বর ঘোষের জন্মনিয়ন্ত্রণ ) । মধ্যবিত্ত বাবু সমাজের কাছে তাঁদের লেখাকে ভাষা বলে মনে করা হয়নি, বরং মনে করা হয়েছে বাড়ির-চাকর-বাকররা যে বুলিতে কথা বলে সেই বুলিতে হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের কবিতাকে নিমজ্জিত করতেন । কোনো কোনো আলোচকের দৃষ্টিতে তা ছিল বন্য-মতবিরোধিতা, আবার কারোর কাছে সাঙ্ঘাতিকভাবে আপত্তিকর, কিন্তু ক্ষমতার শোষণ ও শাসনে ক্রুদ্ধ জনগণের কাছে হাংরিদের কবিতা ছিল তাঁদের কন্ঠস্বর । ত্রিদিব মিত্র হত্যাকাণ্ড কবিতায় লিখেছিলেন :

 

“ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়

সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়”

 

তাঁর কন্ঠস্বর, সামাজিক পেষণের তলায় চাপা দেয়া হয়েছে, শহরের ট্রাম আর ট্র্যাফিকের গর্জনের আড়ালে, তা ছিল হাংরি আন্দোলনকারীদের অস্ত্র, যার ফলে বহু নিম্নবর্গের কবি-লেখক, যাঁদের কখনও সাহিত্যের মঞ্চে জায়গা দেয়া হতো না, তাঁরা নিজের স্হান গড়ে নিতে পারলেন । তাঁরা পেলেন লেখকের সন্মান, তা সে বিশৃঙ্খলা ও মৃত্যুর চাকরি হলেও পরোয়া করা হয়নি । পথচারীদের মতো ঝড় তোলার মহা-আয়োজন ছিল হাংরি আন্দোলনকারীদের । সাহিত্য জগতে উথালপাথাল ঘটাবার পর তাঁরা জোকার, ভাঁড়, পুরাণের চরিত্রদের ক্যারিকেচারের মুখোশ পাঠিয়েছিলেন রাজনীতিকদের, বিদ্যায়তনিক কর্মকর্তাদের, আমলাদের এবং সেই সমস্ত লোকেদের যাঁরা শোষণকারী ক্ষমতাবিন্যাসের খেলুড়ে ছিলেন । সেই উপহারগুলোর ওপরে লেখা থাকতো ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’।

তাঁদের দুঃসাহস বুর্জোয়া সংবেদনকে আঘাত হানলো, বেশ তছনছ করে, অতিশয় ক্রুদ্ধ করে । বিট জেনারেশনের কবিরা হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহযোগীতা করলেন । ‘এল কর্নো এমপ্লুমাদো’ পত্রিকার সম্পাদিকা মার্গারেট র‌্যাণ্ডালকে মলয় রায়চৌধুরী লিখেছিলেন, “তোমাদের লেখাপত্র যদি ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠাও তাহলে আমরা সেগুলো আমাদের ভাষায় অনুবাদ করে এখানকার পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পারব ।”

ইয়েটস লিখেছিলেন….

“থিংস ফল অ্যাপার্ট ; দি সেন্টার ক্যাননট হোল্ড ;

মেয়ার অ্যানার্কি ইজ লুজড আপঅন দিস ওয়র্লড”

 

ষাটের দশকের কথা ভাবলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অস্হিরতা এবং আরও অস্হিরতার ছবি। এই সময়ের পরেই নকশাল আন্দোলন  তাত্বিক আদর্শ নিয়ে ভীষণভাবে দেখা দিলো । অস্হিরতার তরঙ্গ বইতে লাগলো সারাটা দেশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত, যা বাস্তবায়িত হতে দেখা গেল নানা ধরনের দাঙ্গা আর রাষ্ট্র-আয়োজিত হত্যাকাণ্ডে । সেগুলো ছিল স্বাধীনতার সময়ে দেয়া কথার খেলাপি । কিন্তু অশান্তি ছিল সর্বত্র। সমীর রায়চৌধুরী হাংরি পত্রিকার একটি নেপালি সংস্করণও এই সময়ে প্রকাশ করেছিলেন ( প্রচ্ছদ হাংরি শিল্পী অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা ) ।

ষাটের দশক ছিল সমাজ বিপ্লবের মহাকাল । ব্রিটিশদের চাপানো রক্ষণশীলতা পালটি খেয়ে গেল যৌনবিপ্লবের হাতে, যে বিপ্লবে ফাটল ধরে গেল পুরোনো পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রাচীরে । শহুরে পথপার্শ্বে গজিয়ে উঠতে লাগল হিপিদের কমিউনিটি এবং লাইসারজিক অ্যাসিডে নিমজ্জিত একটি প্রজন্ম । এ-কথা সত্য যে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি বহু দেশের এবং আইডেনটিটির মানুষদের তার সঙ্গে একাত্ম করতে পেরেছিল, যার দরুন কবিতাটি স্প্যানিশ, ইটালিয়ান, ফরাসি এবং আরও বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছিল । ক্ষুধা ছিল একটি বুনিয়াদি সমস্যা । যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল তা হলো শ্বাসবদ্ধকর সামাজিক অবস্হা । অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তার সমুদ্রের আছাড় খেয়ে ভেঙে পড়ছিল তাবৎ কাঠামো ।

হিপি কমিউনগুলো স্বপ্ন দেখছিল ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন করে গড়ে তোলার, যখন কিনা অসহায়তায় আক্রান্ত হাংরি আন্দোলনকারীরা হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের জন্য দায়ি ক্ষমতাচক্রের ওপর নিজেদের যৌথ শোক থেকে সংগ্রহ করা বিষ ঝরাচ্ছিল ।

মলয় রায়চৌধুরী এখনও শব্দের যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করেননি । কবিতা লেখার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল । তা সত্বেও হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের শান দেওয়া কবিতার পত্র-পত্রিকা বিলি করে গেছেন কলেজের করিডরে এবং রাজপথে । যেমন-যেমন তাঁদের প্রভাবের প্রসার পশ্চিমবাংলা ছাড়িয়ে অন্যত্র ঘটতে লাগল, রাজ্য সরকার, তখন মার্কসবাদীরা সরকারে এসেছে, হাংরিদের কন্ঠরুদ্ধ করার প্রয়াস করল । বেশ কিছু লেখককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল । কেউ কেউ আন্দোলন ছেড়ে পালিয়ে গেল এবং নিজেদের হাংরি সহলেখকদের বিরুদ্ধে কথা বলা আরম্ভ করল । যাঁরা এই আন্দোলন আবেগের সঙ্গে আরম্ভ করেছিলেন তাঁদের বেশ ক্ষতি হয়ে গেল । শেষ পর্যন্ত স্তিমিত হয়ে গেল আন্দোলন । তবু অনেকের কলম এখনও লিখে চলেছে, সাহিত্যজগত মলয় রায়চৌধুরী এবং তাঁর মতো বিপ্লবীদের সম্পর্কে গর্বান্বিত, যাঁরা তাঁদের কলম এখনও থামাননি এবং ঈথারে উথালপাথাল ঘটিয়ে চলেছেন ।

আইসিটেলস. কম

৮ই মে, ২০১৬