‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার মলয় রায়চৌধুরী সংখ্যা ( সেপ্টেম্বর ২০১৯ )

IMG_20190823_171902

IMG_20190823_172049

Advertisements
Image

হাংরি আন্দোলনের কবি সুবো আচার্য’র কবিতা

69349530_458710754680298_1403361262384971776_o

সাতদিন পত্রিকায় দেয়া মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

সাতদিন পত্রিকায় দেয়া মলয় রায়চৌধুরীর  সাক্ষাৎকার

মলয় রায়চৌধুরী ( ১৯৩৯ ) একজন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রবন্ধলেখক ও অনুবাদক । পশ্চিমবঙ্গে ষাটের দশকে যে চারজন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন ( অন্যেরা হলেন দেবী রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সমীর রায়চৌধুরী ), তিনি তাঁদের অন্যতম । কবিতা লেখার জন্য ১৯৬৪ সালে তাঁকে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল । এ মকদ্দমা তিনি হাইকোর্টে জিতে যান । তাঁর ‘জখম’ কবিতাটি বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে । ১৯৬৮ সালে তিনি মধ্যপ্রদেশের রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন । বর্তমানে তিনি মুম্বাইতে কাণ্ডিভালি শহরতলিতে একটি বহুতলে একরুমের ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক থাকেন । তাঁর মেয়ে, জামাই নাতনিরা বিদেশে থাকেন এবং ছেলে ও ছেলের স্ত্রী থাকেন রিয়াধে, সউদি আরবে ।

 

প্রশ্ন : নিজের লেখালিখির আপনি কি ভাবে মূল্যায়ন করেন ?

উত্তর: কোনো মূল্যায়ন করি না । যেমন খিদে পায়, ঘুম পায়, পেচ্ছাপ পায়, তেমন লেখা পায় বলে লিখি । খিদের যেমন মূল্যায়ন করি না, তেমনই লেখালিখির । মূল্যায়ন করতে হলে অন্যের ধরে থাকা আয়না দরকার । আমি তো নিজের জন্য অন্যের আয়নার প্রয়োজন বোধ করি না ।

প্রশ্ন : আপনার প্রথম লেখা এবং প্রথম বইয়ের অভিজ্ঞতা জানতে চাই ।

উত্তর : আমার প্রথম লেখা দুটি কবিতা, প্রকাশিত হয়নি, কেননা সেদুটি ছিল প্রেমানুভূতি ; একটি বাংলায়, স্কুলের উঁচু ক্লাসের সহপাঠিনী নমিতা চক্রবর্তীকে, যিনি আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সুমিতাদি ; আরেকটি ইংরেজিতে, চুম্বনের দাম হিসাবে, স্নাতকস্তরে নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণাকে, ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের রাণো । প্রথম প্রকাশিত লেখা ইংরেজিতে  ১৯৬১ সালের নভেম্বরে হাংরি ম্যানিফেস্টো, বাংলায় এপ্রিল ১৯৬২তে হাংরি ম্যানিফেস্টো। যে উথালপাথাল ঘটিয়ে ছিল তা কল্পনাতীত । সম্ভবত হ্যাণ্ডবিলের মতন বিলি করা কাগজে তখনও পর্যন্ত সাহিত্য করার কথা ভাবা হয়নি, আর হ্যাণ্ডবিলের মতন ছিল বলে দ্রুত পৌঁছে যেতে পেরেছিল সর্বত্র । প্রথম বই ছিল ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ যে বইটি প্রকাশিত হবার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে পেটরল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিলুম । বইটা বের করার ভার দিয়েছিলুম শক্তিদাকে; উনি ম্যাসাকার করে দিয়েছিলেন, কাউকে দিয়ে প্রূফ দেখাননি, নিজে দেখেননি, অত্যন্ত বাজে কাগজে ছাপিয়েছিলেন এবং পুরো পাণ্ডুলিপি কমপোজ করাননি । আমার উপন্যাস ‘রাহুকেতু’তে আমি ঘটনাটা দিয়েছি । তার পরের বই, যাকে প্রকৃত অর্থে বলা যায় পাঠকের হাতে পৌঁছে দেয়া বই, তা হল ‘কৃত্তিবাস’ থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্হ ‘শয়তানের মুখ’,  প্রকাশক ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । বইটি এবং আমাকে নিয়ে কলকাতায় হইচই হচ্ছে জেনে তিনি আমেরিকা থেকে ১৩ জুন ১৯৬৪ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনি মলয়কে এত পছন্দ করছেন — কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে বিশ্বাস করেন না ।” আবার কলকাতা ফিরে যখন দেখলেন যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু আমার বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেছেন, তখন উনি তুরুপের তাসটি খেলে আমার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেলেন ! জীবনের এমনতর ঘটনাকে কী বলবেন ?

প্রশ্ন : বাংলাসাহিত্যের কোন শাখা তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ বলে আপনি মনে করেন ?

উত্তর: কবিতা তো অবশ্যই, এবং প্রবন্ধ । কবিতা লেখার জগতটা কারোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকছে না, কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক কলকাঠি নাড়া সত্ত্বেও । আর এখন ইনটারনেট হয়ে এলাকাটা সম্পূর্ণ স্বাধীন ; শব্দ, বাক্য, ছন্দ, বিন্যাস নিয়ে যথেচ্ছ বিস্তার ঘটিয়ে চলেছেন তরুণ কবিরা, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় যে কবিতা লেখা হচ্ছে, যেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ পড়ার সুযোগ পাচ্ছি, তার পাশে বাংলা কবিতাকে রাখলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। গল্প-উপন্যাস এখনও বিষয়নির্ভর হয়ে রয়েছে, আলোচকরা গপপো নিয়ে চিন্তিত, যেকারণে আমরা জয়েস, প্রুস্ত, কাফকা, ফকনার, মার্কাজের মতন গদ্যশিল্পী পাইনি; গল্প-উপন্যাসের বাংলা গদ্য এখনও ইউরোপীয় ভাষাগুলোর স্তরে তাই পৌঁছোয়নি ।

প্রশ্ন : বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির যুগে সাহিত্য জীবনে কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পারে ?

উত্তর : প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারলুম না । জীবনের প্রতিফলন সাহিত্যে ? নাকি সাহিত্যের প্রতিফলন জীবনে ? পশ্চিমবঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এমনই হাল যে ভালো ফলাফল করলেই ছাত্ররা রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে পালান, তারপর বিদেশে পালান ।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় লেখক সম্পর্কে কিছু বলবেন কি ?

উত্তর : সারা জীবন কেবল একজন তো আর প্রিয় লেখক হতে পারেন না ; বয়সের সঙ্গে, পাঠ-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যাঁদের লেখার প্রতি আকর্ষিত হয়ে্ছি, তাঁরা পালটে যেতে থেকেছেন । তবে কিছুকাল আগে  যে বই দুটো আমি বহুবার পড়েছি তা হল ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচুড’ এবং পামুকের ‘রেড’ । আমি কিন্তু বই সংগ্রহ করি না ; বইয়ের লাইব্রেরি নেই আমার । বই আর পত্রিকা পড়া হয়ে গেলে বিলিয়ে দিই । আমার কোনো স্টাডিরুম, লেখার টেবিল, পড়ার ঘর জাতীয় ব্যাপার নেই । আর আজকাল তো কাগজ-কলমও ব্যবহার করি না । যাঁরা বাড়িতে সাক্ষাৎকার নিতে আসেন, তাঁদের পিলে চমকে যায় ।

প্রশ্ন : আপনার নিজের প্রিয় লেখা কোনটা এবং কেন ?

উত্তর : ‘নখদন্ত’ নামে একটি সাতকাহন । রামায়ণ থেকে সাতকাহনের আইডিয়া আর মহাভারত থেকে গল্পের ভেতরে গল্পের ভেতরে গল্প টেকনিক প্রয়োগ করেছি, সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত রোজনামচার টুকরো-টাকরা, আর পশ্চিমবাংলায় পাট চাষ-চট শিল্পের বিলুপ্তির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপট । এটা প্রিয় এইজন্য যে এই বইটা লিখে আমি হ্যাপি ফিল করেছিলুম ।

প্রশ্ন : আপনার লেখালিখির পেছনে মূল প্রেরণা কি ?

উত্তর : এটা অ্যাডিকশান । অ্যাডিকশানের বোধ হয় প্রেরণা হয় না ।

প্রশ্ন : শর্তসাপেক্ষে লেখালিখি ছেড়ে দিতে বললে কি ছাড়তে পারবেন ?

উত্তর : জানি না ভারতের সাহিত্য একাডেমিকে লেখা আমার চিঠিটা বাংলাদেশে পৌঁছেচে কিনা । চিঠিটা আমি এখানে তুলে দিচ্ছি ; মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া আছে চিঠিটিতে ।

April 30, 2004

Prof K. Satchidanandan

Secretary

Sahitya Akademi

Rabindra Bhaban

35 Ferozeshah Road

New Delhi

 

Dear Sir

Refusal to accept Sahitya Akademi Award

 

Thanks for your telegram dated 30.4.2004 conveying that my translation work of Dharmaveer Bharati’s “Suryer Saptam Asva” has been awarded the Sahitya Akademi Translation prize.

I am constrained to refuse this award. As a matter of principle I do not accept literary and cultural prizes, awards, lotteries, grants, donations, windfalls etc. They deprave sanity.

My decision to refuse the award is in no way to affront late Dharmaveer Bharati, who was a great admirer of my work, and had supported me during my literary ordeals in 1960s when most of the Bengali intelligentia had conspired against the Hungryalist movement. Your magazine the “indian Literature” itself had never bothered to write about this movement.

Sincerely

Malay Roychoudhury

আর কী শর্ত থাকতে পারে ?  জেনিফার লোপেজের সঙ্গে মহাকাশযানে করে অন্তরীক্ষে এক পাক খেয়ে আসা বা ক্যাটরিনা কাইফের সঙ্গে জাহাজের রেলিঙে দাঁড়িয়ে পেংগুইনদের সাঁতার দেখা ?

প্রশ্ন : একজন লেখকের ভেতরের ‘মানুষসত্তাকে’ আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন ?

উত্তর : কোনো লোক লেখক হয়েছে বলেই তো আর তার ভেতরের মানুষসত্তাটা পালটে যেতে পারে না । সে লেখক না হলেও তার মানুষসত্তাটা যা ছিল তাই থাকবে । আসেপাশে লেখকদের যা সব কাণ্ড-কারখানা দেখি, তা থেকে স্পষ্ট যে তারা লেখক না হলেও ওই সমস্ত কাজ-কারবারই করত । আমি লেখক না হলেও মানুষটা আমি যা রয়েছি তা-ই থাকতুম । আমার সত্তা জিনিশটায় যদি বাইরের কোনো উপাদানের অবদান থেকে থাকে তাহলে তা শৈশবের বিহারি অন্ত্যজ আর দুস্হ মুসলমান অধ্যুষিত ইমলিতলা পাড়ার একলেকটিক পরিবেশ ; যেকোনো বাড়িতে যেকোনো সময়ে প্রবেশ করতে পারতুম, এমনকি পাড়ার মসজিদেও, যা বর্তমান ভারতীয় সমাজে অকল্পনীয় ।

প্রশ্ন : মৃত্যুকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন ?

উত্তর : সত্যি বলতে কি, মৃত্যু সম্পর্কে আমি বেশ কনফিউজড ।

প্রশ্ন : লেখালিখি ছাড়া আর কি আপনার কাছে প্রিয় এবং অপ্রিয় ?

উত্তর : আমি খেতে ভালোবাসি । বয়সের কারণে নানা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে গিয়েও যতটা পারা যায় খাওয়ার ব্যাপারটায় রদবদল করতে থাকি । আমি রাঁধতেও পারি । আমি আর দাদা রান্নাঘরে মাকে টুকিটাকি সাহায্য করার সময়ে অনেককিছু রাঁধতে শিখে গেছি । মাঝে ভেবেছিলুম যা রান্নার রেসিপি নিয়ে একটা বই বের করব, তা আর হল না । আমি বিরক্ত হই আমার একাকীত্ব বিঘ্নিত হলে, এমনকি আশেপাশের আওয়াজও আমার একাকীত্বকে নষ্ট করে বলে বিরক্ত হই । আমি বেসিকালি একজন লোনার, একা থাকতে ভালোবাসি ।

প্রশ্ন : সাহিত্যের বাইরে আরো একটি প্রশ্ন, আপনার বন্ধু এবং শত্রুকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন ?

উত্তর : বন্ধু বলতে যা বোঝায় তা আর আমার নেই । স্কুল-কলেজে ছিল আমার তিনজন বন্ধু, সুবর্ণ-বারীন-তরুণ । তারপর থেকে আমি বন্ধুহীন । আমার একাকীত্বপ্রিয়তার জন্যই বোধহয় আমি বন্ধুহীন । এই এখন হঠাৎ যদি আমার স্ত্রীর কিছু হয়, এমন কেউই নেই যাকে ডাক দিতে পারব । অমন পরিস্হিতিতে ডাক দিতে হবে অ্যাম্বুলেন্সকে । শত্রুও নেই । কেনই বা কেউ শত্রুতা করবে ? লেখালিখির জগতে অনেকে অনেক কিছু লেখে আমার বিরুদ্ধে ; তার জন্য তাদের শত্রু তকমা দেয়া উচিত হবে না ।

মলয় রায়চৌধুরীর অবন্তিকা : জয়িতা ভট্টাচার্য

 

বাংলা সাহিত্যে নারী কালি ও কলমের মতোই অনিবার্য।নারী রহস্যময়ী,ছায়াবৃত,তার দেহবল্লরী তার মায়াময় রূপ সবই সাহিত্যের উপাদান।চর্যাপদ ও বৈষ্ণব পদাবলির মূল রাধা কৃষ্ণ প্রেমলীলাকে ভক্তি একসঙ্গে দেখা হয়েছিলো।

যদিও বাংলা সাহিত্যের প্রাচ্যের মতো কোনো পর্ববিভাগ যথার্থ রোমান্টিক যুগ,আধুনিক ও উত্তরাধুনিক যুগের স্পষ্ট বিভাজন নেই তবু লেখনশৈলীর ও ভাবগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

 

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আমরা প্রায় প্রথম নারীর গভীর ভূমিকা ও গুরুত্ব দেখতে পেলাম।তাঁর নারী কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কল্পনার নারী নয়।তাঁরা তাঁর বাস্তব জীবনে ও মনোজগতে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছেন।

অনুপ্রেরণাদাত্রী কাদম্বরী দেবীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন অনেক কবিতা,কখনো স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর জন্য বিরহকাতর প্রেমের কবিতা।যাদের স্পর্শ তাঁকে একদ- শান্তি দিয়েছেন, লিখেছেন তাঁদের নিয়েও কবিতা।

“আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা করে

তার পরনে ঢাকাই শাড়ি,কপালে সিঁদুর “।

আবার চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে কবি নারীর মাধুর্য ও শক্তিশালী রূপের প্রকাশ করেছেন।কুরূপা ও সুরূপার মধ্যে অপূর্ব দোলাচল।

“পূর্বে উল্লিখিত কবিদের সৃষ্ট নারীরা সকলেই যেন স্বপ্ন।ফ্যান্টাসি।তাদের বাস্তবের শক্ত মাটিতে ,কষ্ট যন্ত্রণা র লেশমাত্র ছোঁয়না।কেবল মাধুর্য। জৈবিক ও জীবন জারিত নারীর কথা বলার ঝুঁকি কোনো কবি কিন্তু নেননি জনপ্রিয়তার বা বানিজ্যমূল্যের কথা ভেবে হয়তোবা!”

আরেকটু অগ্রসর হলে দেখা যায় কবি নজরুল ইসলাম নারীকে কবিতায় কখনো মাতৃরূপে পেতে আকুল হয়েছেন আবার প্রেয়সীর জন্য ব্যাকুলতা তাঁর বিরহের কবিতায় “প্রিয়া রূপ ধরে এতদিনে এলে আমার কবিতা তুমি/আঁখির পলকে মরুভূমি হয়ে গেল বনভূমি “।স্বয়ং কবিতাকেই নারীরূপের কল্পনা করেছেন।

অন্যদিকে আধুনিক যুগে কবি জীবনানন্দ ভিন্ন মেরুতে থেকে নারীকে অবলম্বন করে কবিতা লিখেছেন।নারী সেখানে ইমেজারি ও পরমাপ্রকৃতির দ্যোতক।কখনো সুপ্ত কামনার প্রতীক কখনো বা শূন্য হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।এভাবেই আজ বিশ্ব বাংলার এক ফ্যান্টাসি “বনলতা সেন” ক্লাসিক হয়ে গেছেন।

“কোথায় গিয়েছ তুমি আজ এই বেলা

মাছরাঙাটা ভোলেননি ত দুপুরের খেলা

শালিখ করেনা তার নীড় অবহেলা

উচ্ছাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন

তুমি নাই বনলতা সেন”

 

পরবর্তী কালে আরেক নারী বিখ্যাত হয়ে গেছেন কবিতার মাধ্যমে।তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ” নীরা”।নীরাকে তিনি দেখেননি তাঁর দেখা বিভিন্ন নারী সান্নিধ্যের কোনো কোনো মুহূর্ত দিয়ে গড়া এই আদ্যন্ত কাল্পনিক নারী।

 

“নীরার শরীর খারাপ হলে সবার মন খারাপ হয়”।

“…..আজই কি ফিরেছ?

স্বপ্নের সমুদ্রে সেকি ভয়ঙ্কর মেদহীন শব্দহীন যেন

তিনদিন পর আত্মঘাতী হবে

হারানো আংটির মতো দূরে

তোমার দিগন্ত দুই উড়ুক্কু ডুবে কোনো

জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো

অথচ একলা ছিলে,

ঘোরতর স্বপ্নের ভিতর তুমি একা”

 

সুনীল নিজেই দুঃখ করে বলেছেন তিনি অনেকবার চেষ্টা করেছেন নীরাকে রক্ত মাংসের মানুষী হিসেবে উপস্থাপন করতে কিন্তু তা প্রতিবার পেরিয়ে গেছে শিল্পীর সীমানা।

নীরা একটা কনসেপ্ট হয়ে থেকে গেছে।আবেগ বর্জিত ও কোনো শরীরী আবেদনবিহীন এক আইডিয়াল প্রেয়সী এবং তুমুল জনপ্রিয়।

 

পূর্বে উল্লিখিত কবিদের সৃষ্ট নারীরা সকলেই যেন স্বপ্ন।ফ্যান্টাসি।তাদের বাস্তবের শক্ত মাটিতে ,কষ্ট যন্ত্রণা র লেশমাত্র ছোঁয়না।কেবল মাধুর্য।কিন্তু এক প্রেয়সী সে বাস্তবিক তা হয় না।তারও পরাজয় আছে।

ক্লেশ,বেদনা মাটির সোঁদা গন্ধে ভরা তার শরীর।

সেই জৈবিক ও জীবন জারিত নারীর কথা বলার ঝুঁকি কোনো কবি কিন্তু নেননি জনপ্রিয়তার বা বানিজ্যমূল্যের কথা ভেবে হয়তোবা!

ফলে এইসব নারীকে ভাবতে গেলে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়।ট্র্যাডিশনাল এলিটিস্ট কোনো নারী যার গমের মতো রং ,মসৃণ আজানুলম্বিত কেশ,কাজল আঁখি এসব মনে করে নেওয়া যায় ।

ঠিক এই এলিটিস্ট কনসেপ্ট টাই ভেঙে দিয়েছেন হাংরি আন্দোলনে র পুরোধা পোস্টমডার্ন কবি ,সাহিত্যিকরা মলয় রায় চৌধুরী।

 

তার প্রেমিকা ” চুমু খেয়ে টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছে নেয়” ,

 

“মাথা বেয়ে ওঠে বুনো মহিষের সিং

ঝড়ের মস্তি দিয়ে পাউডার মাখিয়ে দিস অবন্তিকা ” বা হরিণের নাচের সঙ্গে কাতুকুতু ”এমন সব অতিবাস্তব নিত্য ব্যবহৃত শব্দ প্রয়োগ করার ঝুঁকি,এমন অভিনবত্ব বাংলা প্রেমের কবিতায় মেটাফর ব্যবহার করার ঝুঁকি বোধহয় একমাত্র মলয় রায় চৌধুরী নিতে পেরেছেন ।

মলয় তাঁর কবিত্বের ভারী চোগাচাপকান ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছেন এক স্বাভাবিক কামার্ত প্রেমিক।তাঁর সাহিত্য সত্ত্বা বিলীন হয়ে গেছে মানবসত্ত্বায়।

আর তাই তাঁর প্রিয় নারী “অবন্তিকা”এক ব্যতিক্রমী উত্তরাধুনিক নারী।মলয় অনায়াসে লেখেন,

“বোঁটায় তোর গোলাপ রং অবন্তিকা

শরীরে তোর সবুজ ঢাকা অবন্তিকা

আঁচড় দিই আঠা বেরোয় অবন্তিকা

চাটতে দিস নেশায় পায় অবন্তিকা

টাটিয়ে যাস পেট খসাস অবন্তিকা “(পপি ফুল)

 

“কবিতায় নারীদের মধ্য ইমেজারি, ফ্যান্টাসি বা শুধু মাধুর্য ভেঙে দিয়ে একমাত্র মলয় রায় চৌধুরী সৃষ্টি করতে পেরেছেন উত্তরাধুনিক নারী”অবন্তিকা ” এক রক্ত মাংসের নারী তার যাবতীয় যৌনতা,রিরংসা,ক্রোধ …..তার কৃষ্ণকালো দেহ বল্লরী নিয়ে সে জৈবিক কবিতা।যে কবিতা পুরুষ এমনকি নারী পাঠককে নড়িয়ে দেয়।

“অবন্তিকা”কোনো মিথ নয় সে পাশের বাড়ির র মেয়েটি ,সে ইমলিতলার নারী,সে অন্ত্যজ মুসলমান নারী অথবা লক্ষ্নৌ এর হারেম থেকে বিতারিত হতদরিদ্র নারী ,উপজাতি নারী।

।মলয় রায়চৌধুরীর অবন্তিকা তীব্র শরীরী।

এই প্রসঙ্গে বলাই যায় মলয় রায় চৌধুরী জীবনের বাস্তবতাকে সাহিত্য করে তুলেছেন।তা ইচ্ছে মতো ম্যাজিক রিয়ালিজম এ উত্তীর্ণ হয়েও সে জীবন্ত এক শারীরিক নারী।

এর আগে কবিরা কাব্য সাযুজ্য শব্দ র বেড়া টপকে যাবার সাহস পাননি।কিন্তু অবন্তিকাকে মলয় রায়চৌধুরী টেনে হিঁচড়ে গেঁথে দিয়েছেন মাটির গভীরে।

অবন্তিকা ‘শরীরেই সার্বভৌম মননে নয় মনে করে যেসব মহিলা, মলয় তাঁদের অনায়াসে ডাকতে পারেন ‘মুখপুড়ি’।

অথচ পরক্ষণেই পড়ি

“শ্বাস ভ্যাপসা চোখের তলায় যুদ্ধ চিহ্ন এঁকে ডেথ মেটাল মাথা দোলাচ্ছিস”এর মতো যাদুবাস্তবতা।

চ-ী তে যেভাবে দুর্গাকে বর্ণনা করা হয়েছে প্রায় সেভাবেই দুঃসাহসী এই কবি লিখেছেন,

“অবন্তিকা বললি তুই:

আর্কিমিডিস দিলেন দেহের ঘনত্ব।

রেঁধে দেকার্তে দিলেন শরীরের বাঁকগুলো।

ইউক্লিড দিলেন গোপন ত্রিভুজ!

লোবাচোভস্কি দিলেন সমন্বিত আদল!

ব্রহ্মগুপ্ত দিলেন মাংসময় বুকের নীঁখুত বাতুলতা!

শ্রীধর দিলেন আয়তন!

 

আর তুই কী দিলি?অক্ষরে সাজানো যত ফাঁকা মন্তর?

 

আমি বললুম :

আমি দিয়েছি প্রেম

অবন্তিকা তুই বললি

প্রেম ত আলো হয়ে বেগে আসে

আর তত বেগে চলে যায়”

 

অনবদ্য ভাষায় মলয় রায় চৌধুরী র অবন্তিকা তাই আল্ট্রামর্ডান এক পরিপূর্ণ ও ইউনিভার্সাল নারী।কবিতা নারী।

 

পোস্টমডার্ন সাহিত্যে বাংলা কবিতায় নারীর এই ক্রম বিবর্তন কবিতাকে বিশ্ব সাহিত্য সম মানে উত্তোররণ করেছেন বিভিন্ন কবি যার পথিকৃত সেই আধুনান্তিক কবি রবীন্দ্রনাথ।

 

উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন : রাজা সরকার

21640997_1839222192773999_8708918755340852804_o

রাজা সরকার ও অলোক গোস্বামী

প্রিয় মলয় রায়চৌধুরি।

আপনার  conversation পড়লাম। ভালো লাগলো। তবে এর অধিকাংশটাই আগে আপনার কোনো না কোনো লেখায় পড়েছি।

 

কিন্তু এই লেখাটি লিখছি অন্য একটি কারণে। সেটি হলো শিলিগুড়িতে আমাদের লেখালেখি বা পত্রিকা প্রকাশের বিষয়ে আপনার উল্লেখের মধ্যে কিছু তথ্যগত ভুল থেকে যাচ্ছে। যেমন আমি ‘ধৃতরাষ্ট্র’ এর সম্পাদক বা প্রকাশক ছিলাম না। ছিল মনোজ রাউত। আমি একই সঙ্গে একটি স্বল্পকালীন পত্রিকা করেছিলাম। নাম ‘কুরুক্ষেত্র’। আর এসব চলছিল সত্তর দশকের শেষ কয়েকটি বছর ও আশির শুরু পর্যন্ত। ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ শুরু হয় তারপর। আর তা কখনো একা অলোক গোস্বামী করতো না। এটা যৌথ ভাবে করা হতো। তবে মূল কাজটার বোঝা আমার এবং অলোক সহ আরো কয়েকজনের উপর থাকতো।  এই বিষয়ে আমার একটি সংক্ষিপ্ত লেখার অংশ বিশেষ তুলে দিলাম।

 

কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।

**রাজা সরকার।

 

 

———-তখন ১৯৭৭ ,৭৮। এই সময়ে আমি আর সমীরণ ঘোষ একটি ঠিকঠাক  লিটল ম্যাগাজিনের  সন্ধানে আমরা দুজন খুব উদগ্রীব হয়ে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় মিলিত হই স্থানীয় কোর্ট মোড় সংলগ্ন গ্রন্থাগারগুলোতে। তার একটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং অন্যটি তরাই হরসুন্দর–। এই সময়েই একদিন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের রিডিং টেবিলে একটি শীর্ণ পত্রিকার সন্ধান পাই। নাম ‘ধৃতরাষ্ট্র’। সম্পাদক মনোজ রাউত। ততদিনে অবশ্য ‘পাহাড়তলী’ আর ‘আসমুদ্র হিমাচল’ নামে আরো দুটি পত্রিকার নাম আমরা শুনেছি বা দেখে ফেলেছি। অচিরেই ‘ধৃতরাষ্ট্র’ সম্পাদক মনোজ রাউত সম্পর্কে খোঁজ খবর করে একদিন তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় পর্ব সাঙ্গ হয়ে গেল। যেন আমরা পরস্পরকে খুঁজছিলাম। সেই পর্ব ছিল সেদিন বেশ দীর্ঘ এবং শেষ হয়েছিল একটি গোপন পানশালায়।

 

শিলিগুড়ি শহর তখনও লিটল ম্যাগাজিনের জন্য শুনশান । ছোট কাগজ বলতে ঐ দু’চারটে যা বের হয় তা অনেকটা নির্বাক যুগের কথা মনে করিয়ে দেয় । হয়তো তাতে কখনো দু’চারটে ভাল লেখার হদিশও আছে, কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের আধার সেখানে তৈরি হয়নি । লেখালেখির বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক গাম্ভীর্য তখনো লিটল ম্যাগাজিনের জন্মের অন্তরায় । ঠিক এই রকম এক আবহে নতুন করে শিলিগুড়িতে একটি লিটল ম্যাগাজিনের শুরু। নাম “ধৃতরাষ্ট্র”। পাত্র মিত্ররা মনোজ রাউত,সমীরণ  ঘোষ,পল্লব কান্তি রাজগুরু, চন্দন দে ও রাজা সরকার। লেখা ও  জীবন খুব কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রচেষ্টার সেই শুরু । শুরু লেখার ভাষা ও স্বভাব চরিত্রের  পরিবর্তনেরও । আর তার জন্য ক্রমশঃ যে সামাজিক ঘাত প্রতিঘাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছিলো তা বলা বাহুল্য । কিন্তু  দমে যাওয়ার বদলে  ক’বছরের মধ্যেই  ব্যাপারটি আরো সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ওঠে ।

 

 

———এরকম একটি পরিবেশে একসময় শিলিগুড়ির অন্তত ৬/৭টি লিটল  ম্যাগাজিন মিলে  একযোগে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করা শুরু হয়ে গেল । যার নাম ছিল  “কনসেনস্ট্রেশন ক্যাম্প” । সময়টা ১৯৮৩। এটিকে শিলিগুড়ির লিটল ম্যাগাজিনের দ্বিতীয় পর্ব বলা চলে। । আমাদের সবারই কমবেশি অভিজ্ঞতা বলছিল ব্যাক্তিগত ভাবে এক দুইজন মিলে একটি কাগজ করার চেয়ে সংঘবদ্ধভাবে একটি লিটল ম্যাগাজিন কে একটা আন্দোলনমুখী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া অনেক জরুরী। যাতে  আমাদের ভাষা ভাবনার আধার হতে পারে পত্রিকাটি। সক্রিয় লেখকসুচি হলো এরকম– অলোক গোস্বামী, প্রবীর শীল,রতন নন্দী, কিশোর সাহা,কুশল বাগচি,সুমন্ত ভট্টাচার্য,মলয় মজুমদার, মনোজ রাউ্‌ সমীরণ  ঘোষ, রাজা সরকার সহ আরও  অনেকে । শিলিগুড়ি শহরের বইপাড়াটাকেই সকাল বিকেল আমাদের পত্রিকার চলমান অফিস হিসেবে ধরা হতো। যেখানে আলাপ আলোচনা লেখালেখির নিয়ে তুমুল তর্ক বিতর্ক চলতো। চলতো পত্রিকা প্রকাশের যাবতীয় পরিশ্রমের কাজ। আশেপাশের মানুষজন এইসব কান্ড দেখে প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও পরে একসময় মেনে নিয়েছিল।

 

এই  পর্বে আমার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে ষাট দশকের হাংরি জেনারেশনের লেখকদের । তখন এমন নয় যে হাংরি লেখকরা খুব সক্রিয়। তাদের সক্রিয়তা বা আন্দোলন অনেক আগেই ১৯৬৪/৬৫তেই স্তিমিত হয়ে গেছে। কিন্তু যেহেতু এটি একটি সাহিত্য আন্দোলন তার রেশ বা রচনার মৃত্যু ঘটেনি। শিলিগুড়িতে আমাদের মত  নতুন পাঠকের কাছে তা নিঃসন্দেহে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু এটা খুবই  আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত হলেও এই আন্দোলন সম্পর্কে শিলিগুড়ির লেখা জগৎ তখনও অন্ধকারে। খোঁজ খবর বইপত্র কিছুই পাওয়া যায়না।  তার উপর তখনো অতীতের নানা চাপের ফসল হাংরি লেখকদের উপর  দায় হিসেবে রয়ে গেছে । পত্রিকা বের হয় না। নিজেরাও তারা তখন অনেকটা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। তবে এদিক ওদিক থেকে ছিটকে কিছু বই হাতে আসলেও আন্দোলন সম্পর্কে জানার কোন উপায় নেই। আমরা তাদের লেখা পড়ার প্রথম সুযোগ পাই তখনকার ত্রিপুরাবাসী হাংরি কবি প্রদীপ চৌধুরি সঙ্গে যোগাযোগ করার পর। তিনি সেখান থেকে তখন কিছুটা নিয়মিত ‘ফুঃ’নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন।তার  সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে  সন্ধান পাই কবি অরুণেশ ঘোষ এর। তিনি কুচবিহারে থাকেন। হাংরি আন্দোলনের শরিক না হলেও উত্তরবঙ্গের তিনিই একমাত্র এই আন্দোলনের খোঁজখবর রাখতেন এবং তাদের শেষদিকের পত্র পত্রিকায় লিখতেন। তবে তখন তিনি খুব নীরব এবং নিঃসঙ্গ। ইতিমধ্যে তার সম্পর্কে অনেক সত্য মিথ্যা খবর রটানো ছিল। তার মধ্যে একটা ছিল যে উনি কারোর সঙ্গে দেখা করেন না। কিন্তু লেখালেখি নিয়ে আমাদের ভাষা ও ভাবনার সন্ধান তখন এতই তীব্র যে খুব দ্রুত আমি একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কিছু প্রশ্ন নিয়ে তার প্রত্যন্ত গ্রাম হাওয়ারগাড়িতে এক দুপুরে গিয়ে হাজির হই। সব রটনা মিথ্যা মনে হয়। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে  আমার কথা হয়। একসময় আমার লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর উনি ডাকযোগে আমাকে পাঠিয়েও দেন। যা আমার সম্পাদিত কাগজ ‘কুরুক্ষেত্রে’র এর শেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। তারপর  থেকে অনেকদিনই আমাদের সঙ্গে তার সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। এবং  পরবর্তী কালে প্রকাশিত ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ এ তার প্রভাবও ছিল।

 

দ্বিতীয় পর্বের লিটল ম্যাগাজিন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ তখনকার সময়ে প্রকাশিত কাগজগুলোর মধ্যে ক্রমশঃ উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।আশি এবং নব্বই এই দুই দশক জুড়ে এই কাগজটি লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র সম্পর্কে অনেক কথাই বলে। লিটল ম্যাগাজিন বাজারি বড় কাগজের ছিট কাগজ হিসেবে থাকবে, না কি  একটি পৃথক লেখা ভাবনার উপর নির্ভর করে শুধু সাহিত্য-শখ পুরণের খেলার সামগ্রী না হয়ে সময়ের দাবী অনুযায়ী একটি ভিন্ন; যাকে তখনকার মত বলা –প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখার আধার হয়ে উঠবে। আজ আর অস্বীকারের উপায় নেই যে ষাট দশকের হাংরি লেখকরা ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’এর মাধ্যমেই উত্তরের এই সব অঞ্চলে পরিচিতি পান। কেউ কেউ এটাকে হাংরি রিভাইভাল বলে ভাবতে ভালবাসতেন বা মলয় রায়চৌধুরি যেমন এগুলোকে হাংরি ছিট মহল বলে উল্লেখ  করতেন। কিন্তু আমরা জানতাম দুই দশক পরে নতুন করে হাংরি আন্দোলন হয় না। সময় এবং পরিসরের মাত্রা তখন ভিন্নতর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা টের পেলাম একটা হাংরিয়ালিজম দানা বাঁধছে কিছু হাংরি লেখকের মনে। দুই দশক পরে তখন আন্দোলনের একটা তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। হাংরি মেনিফেস্টোর অসম্পুর্ণতা দূর করার চেষ্টা। ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’সেই কাজে কিছুটা ব্যবহৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’এ সুভাষ ঘোষের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর আমরা নানা ভাবে আক্রান্ত বোধ করতে থাকি। সেই সাক্ষাৎকারে হাংরি কনসেপ্ট নিয়ে সুভাষের কথায় অনেকে অস্বস্থি বোধ করেন। অনেকেই আন্দোলন নিয়ে সুভাষের কথার বিরোধিতা করতে গিয়ে আমাদেরও তার সঙ্গে জড়িয়ে নেয়। সঙ্ঘ ভাঙা  মানুষেরা বোধ করি কোন সঙ্ঘ আর পছন্দ করে না। কিন্তু ততদিনে পাশাপাশি আমরা জেনে যাচ্ছি যে হাংরিদের অভ্যন্তরীণ মত পার্থক্য, মামলা কেন্দ্রিক কিছু ব্যক্তিগত বিভেদের সালতামামি। এসব অগ্রাহ্য না করতে পারলেও আমরা আমাদের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছিলাম। ততদিনে কিছুটা বিস্মৃত হয়ে যাওয়া ফাল্গুনি রায় ও অবনী ধর এর লেখা আমরা আমাদের কাগজে পুনঃ প্রকাশ করতে শুরু করি। হাংরি লেখকদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইও ঐসময় কনসেনস্ট্রেশন ক্যাম্পের লেখকদের নিজ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় । যেমন মনোজ রাউত প্রকাশ  করেন শৈলেশ্বর ঘোষের ‘প্রতিবাদের সাহিত্য’এবং অরুণেশ ঘোষের ‘অপরাধ আত্মার নিষিদ্ধ যাত্রা’। অরুণেশের এই বইটি যথেষ্ট বিতর্কিত হয় । বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু বইটিকে অগ্রাহ্য করার ডাক দেয়া হয়েছিল কলকাতার ‘কাগজের বাঘ’এর পক্ষ থেকে। কিছুটা পরের দিকে খুব উল্লেখযোগ্য দুটি কাজ করেন অলোক গোস্বামী। একটি সুভাষ ঘোষের ‘গোপালের নয়নতারা’ও ফাল্গুনী রায়ের একটি রচনা সংকলন প্রকাশ । সাধারণ পাঠকের কাছে ফাল্গুনী রায় তখনও অনেকটা অজ্ঞাত। তার উপর তিনি ছিলেন হাংরি আন্দোলনের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং কিছুটা ব্রাত্য ।  স্বাভাবিক ভাবেই  বইটি কোন পাঠক সহায়তা পায়নি কলকাতাতেও। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফাল্গুনী নিয়ে অনেক উচ্ছাস তৈরি হয় । তার রচনা সংকলিতও হয়। কিন্তু অলোক  গোস্বামীর এই  সংকলনটির উল্লেখ কোথাও দেখা যায় না। কলোনীর স্বভাব আমাদের  যাবে কোথায়! প্রসঙ্গত একটি উল্লেখ ফাল্গুনী রায় বিষয়ে করা যেতে পারে যে ফাল্গুনীর মৃত্যুর পর তার জন্য একমাত্র শোকসভাটি হয় কুচবিহার শহরের একটি ছোট্ট ঘরে । উপস্থিত ছিলেন আহবায়ক হিসেবে অরুণেশ ঘোষ, জীবতোষ দাস,ও অন্য দুএক জন এর সঙ্গে  শিলিগুড়ি থেকে যাই আমি। স্মৃতিচারণে অরুণেশ সেদিন  ফাল্গুনী সম্পর্কে আমাদের কিছুটা অবহিত করেন। ঘটনাটি‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’প্রকাশের আগেকার ঘটনা।

 

দুটি দশক জুড়ে আমাদের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’এর কর্মকান্ড। আমরা না চাইলেও নিজেদের মুদ্রাদোষে আমরা পরস্পর কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি একটা সময়। সেই বিচ্ছিন্নতার মূলে প্রধানত ছিল  প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন, বিতর্ক। পাশাপাশি ছিল আমাদের পরিচিত হাংরি লেখকদের পারষ্পরিক বিদ্বেষপ্রসূত কার্যকলাপ।  আর এই ঘটনাক্রমে  ৬/৭ টি লিটল ম্যাগাজিনএর সঙ্ঘ ভাঙতে শুরু করলো। অলোক ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ থেকে সরে গিয়ে বের করলো ‘ক্রমশ’ ও আরো পরে ‘গল্পবিশ্ব’।   তারপরও বিচ্ছিন্ন ভাবে‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’এর আরো কয়েকটি সংখ্যা  আমার আর সুমন্ত ভট্টাচার্য্যের ব্যবস্থাপনায় বের হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

 

 

 

 

 

 

 

বাসুদেব দাশগুপ্ত-র কবিতা : এয়ার কণ্ডিসানড দেবতা

 

এ এক ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দের রাজ্যে ভাসমান আমাদের ভেলা

দেখা যায় উপকূল বরাবর শত শত মৃতদেহ পড়ে থাকে

দীর্ঘকাল রোদে পুড়ে আকৃতি বিকট

যার প্রাণ একদিন কম্পিত হয়েছিল

দুঃখে সুখে তড়িৎ প্রবাহে

যার প্রাণ একদিন কম্পিত হতে হতে

বাসনা থেকে বাসনায়

ছুটেছিল অই প্রাণ

 

এ এক ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দের মধ্যে ভাসমান আমাদের ভেলা

মাথার উপরে তপ্ত সূর্যালোক

নদীতে সোনালী রং ডানদিকে

সবুজ গালিচাপাতা চর জেগে থাকে

একটা ন্যাংটা লোক অই চরে একা বসে আছে

ভেলা দেখে ঝাঁপ দেয় জলে

প্রবল ঢেউয়ের ঘায়ে ভেসে যেতে যেতে হাত নাড়ে

যেন কিছু বলতে চায়

প্রবল স্রোতের টানে কোথায় তলিয়ে যায় কে জানে

আধ টিন বিস্কুট কিছু ধুতি শাড়ি নিয়ে

ছোটো এই ভেলা ভেসে চলে

 

অন্ধকার হলঘর

নাকে ল্যাভেণ্ডারের গন্ধ

অজস্র মানুষ আপনজনের মৃতদেহ মাড়িয়ে চলে আসছে

এক মুঠো অন্নের প্রত্যাশায় ঝাঁপিয়ে পড়ে

নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করে

মরে

বিদ্যুতের আলোয় শত শত অশরীরী প্রাণী

যদিও সাহায্যের পরিমাণ পর্যাপ্ত নয়

যানবাহনের নিদারুণ অভাব

আর কর্তৃপক্ষ কখনই দুর্গত অঞ্চলে পৌঁছোবার

কোনো উপায় খুঁজে পান না

খননকারীর অভাবে এক থেকে দেড়হাজার পর্যন্ত

একটা গর্তেই কবর দেওয়া হলো হুজুর

মজুরি ছিল সারাদিন দুটাকা

খবরে আরও প্রকাশ ভুতনাথের বাড়ির চারটে লোক

ঘুমন্ত অবস্হায় বাড়ি ধ্বসে মারা গেল

তার অবস্হা সামান্য হলেও অই

ছোট্ট বাড়িখানিতে সুখের কমতি ছিল না

আজ খোলা আকাশের নিচে সামান্য ট্রাক ড্রাইভার ভুতনাথ

হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছে

এস. ডি. ও. জানিয়েছেন ।

দরিদ্র সাহায্য তহবিল থেকে ২০টি টাকাও আজ নয় কারণ

আলমারির চাবি যার কাছে তিনি আজ অফিসে আসেননি

 

আকাশে শকুনের ভিড়…দূষিত আবহাওয়া…বিশতলা টাওয়ারের ওপর বেড়ার…ঘুর্ণিঝড়ের সংকেত…এইমাত্র রিলিফের নৌকো লুঠ হলো…যেখানে মৃত্যু নেই সেখানে পুলিশ এসে হানা দেয়…৩৪ নে জাতীয় সড়কটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে…সাহায্য ফেলার মতো এক টুকরোও জমি নেই…রানওয়েতে একটা পাগলি থালা বাজিয়ে গান গাইছে…রাজধানির পাশেই বসানো হবে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটি…ক্ষিপ্রপদ কেউ হোটেলের কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েছেন…কারোর মাথার খুলি ফুটো করে পাওয়া গেছে বুলেট…বিদ্রোহীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের বয়স ছিল আট বছর…আমাদের ক্ষণিক মনুষ্যত্ব আর চিরকালের জন্য কান্নাকাটি করে না…নরম মাটিতে ডুবে যাচ্ছে…এখন রিং-এর মধ্যে দুটো বাইসনের পরস্পর যৌনসংঘর্ষ…করাল শব্দের আবর্জনা…পোষা শুয়ারের বাচ্চা হিসি করে দিয়েছে সুন্দরীর নাইলনে…পাটখেত থেকে মৃত শিশু কোলে আমাদের মাতা বেরিয়ে এলেন…কয়েকটি নাইলনের শায়াই হয়তো অগ্নিকাণ্ডের কারণ…আকাশে শকুনের ভিড়…সব সভ্যতার আলমারিতেই কয়েকটি কঙ্কাল তুলে রাখা আছে…শকুনের রঙ্গে রিলিফ বিমানের প্রপেলারের ধাক্কা লেগে গেছে…দূরে একটা পাগলি থালা বাজিয়ে গান গাইছে…এবার ওটাও মরবে…

 

আমি দুহাত দিয়ে ঢেকে রেখেছি কান…আমি বাইরের কোনো শব্দ আর শুনতে পাই না…আমি দুহাত দিয়ে ঢেকে রেখেছি আমার কান…আমি নিজের উচ্চারিত শব্দও আর শুনতে পাচ্ছি না…সুতরাং মৃত্যু…

 

তুমি স্নান করতে গিয়ে জল দেখেছ পীতবর্ণ…তুমি স্হির জলে দেখেছ তোমার ছায়া মস্কহীন…তোমার মুখমণ্ডলে বস্ত্রে গাত্রে সর্বদাই শবগন্ধ নির্গত হয়…সুতরাং মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু…

 

মৃতদের মধ্যে আমি পরিত্যক্ত…নীচতম গহ্বরে আমাকে ফেলে রাখা হয়েছে…স্বজনের কাছ থেকে আমাকে দূরে রেখেছো…আমার বেরিয়ে আসার ক্ষমতা নেই…তুমি কি মৃতদের পক্ষে আশ্চর্য ক্রিয়া করবে…প্রেতরা কি উঠে এসে তোমার স্তবগান করবে…কবরের মধ্যে তোমার দয়া কি মৃতরা অনুভব করে…অন্ধকারেই কি তোমার আশ্চর্য ক্রিয়া দেখা যায়…এই বিস্মৃতির দেশে তোমার ধর্ম কি কখনো জানা যাবে…আমাদের মাংসের স্বাস্হ্য নাই…আমাদের অস্হিতে শান্তি নাই…ত্রাস আমাদের উচ্ছেদ করেছে…এখন সকলেই মুখ মোছে আর বলে…আমি কি কোনো অধর্ম করিনি…

 

Review by Kunal Ray: “The Hungryalists” by Maitreyee Bhattacharjee Chowdhury

 

 

A study of the Hungry Generation Poets, who took the Bengali literary establishment in Kolkata by storm in the early 1960s, The Hungryalists also presents a portrait of the city

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

I often think about ways of writing about the city. There aren’t any easy resolutions. Cities have defied norms and stereotypes, and writing about them ought to enable newer insights into unknown aspects, the seamier underbellies that lie far removed from the many accounts that bring to life the pavements and its many activities amongst other issues that remain peripheral. But how does one do it? Should it be a plain city narrative with some historical quirks and sociological data? Or could we locate such writing in the politics of the city and an associated movement? Every writer has her politics and writing is often an extension or embodiment of her political will.

I don’t want to sound prescriptive but Maitreyee Bhattacharjee Chowdhury’s illuminating book The Hungryalists – The Poets Who Sparked A Revolution is in that vein. Besides being a combination of a biography and analytical study of the poetry and poets of The Hungryalist or Hungry Generation Poets who took the genteel Bengali bhadralok literary establishment in Kolkata by storm in the early 1960s, it also presents a portrait of the city like few other contemporary attempts. The 1960s was a period of great turmoil. Kolkata grappled with a saga of unending problems – the refugee crisis, growing disillusionment of the youth, unemployment and a complete dissonance with an effete political system. The poetry of The Hungry Generation expressed this widespread anguish. It was written in the language spoken on the streets devoid of poetic embellishments. They rejected the European modernist sensibility, which had influenced many Bengali poets of the time and shaped a counter aesthetic which shocked and greatly offended the intelligentsia of the city who branded their poetry as ‘crass’, ‘mediocre’ and ‘sensationalist’. Hungryalist poetry was a conscious attempt to offend the custodians of culture. In her introduction, the author writes, “By the time they were done, the world recognized them as the most politically trenchant, culturally influential and innovative artists, whose lives spanned an extraordinary frame, thus changing the larger picture for many. These poets were eccentric, contingent rebels, and these movements were not alternative lifestyles, but life itself.”

The Hungryalist rivalry with the famous Krittibash group lead by the noted poet and writer Sunil Gangopadhyay is captured in vivid detail in the book. Gangopadhyay, who was initially supportive of the poetry of the Hungryalists, turned hostile. Their differences seemed unbridgeable though Gangopadhyay was the publisher of Hungryalist proponent Malay Roy Choudhury’s debut book of poems. Other noted names such as Sandipan Chattopadhyay and Shakti Chattopadhyay eventually left the movement. Some of them were lured by jobs and others wanted to avoid political rivalries that the movement brewed for itself and its members. Allegations apart, the verse of the Hungryalists feels even more relevant in the current bleak political scenario of the country. Benoy Majumdar’s Phire Esho Chaka or Bhaskar Chakraborty’s poems speak to us more now than ever. Shakti Chattopadhyay is never dated. Malay Roy Choudhury’s sense of dejection is even more palpable now.

The book also discusses Allen Ginsberg’s visit to India in 1961 with his lover Peter Orlovsky. They soon became friends with the Hungryalist poets and travelled with them to rural Bengal and spots in Kolkata city. When Malay Roy Choudhury and other Hungryalist poets were arrested by the Police in 1964 on charges of obscenity and subterfuge, Ginsberg organized support for them and wrote to several others asking for their immediate release.

I am often asked, “What can poetry resist? Can poetry change anything?” There are no easy answers but poetry is a living archive, a memorial to life. Isn’t that good enough? Poetry lends us a vision in a way only it can. And what is poetry without people? Maitreyee Bhattacharjee Chowdhury locates this poetry and the poets amongst the people of the time, which helps us ascertain their anti-establishment views. It also forces me to wonder what Hungryalists would do if they had to write poetry today. What would their imaginings of the city be? And how would the powers that govern us react to their verse?

This is an important book. Read it!

Kunal Ray teaches literary & cultural studies at FLAME University, Pune

                                First Published:   Hindustan Times             Jul 12, 2019 19:38 IST